ধেয়ে আসছে ‘সুপার এল নিনো’: রেকর্ড তাপমাত্রার ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ বিশ্ব
স্টাফ রিপোর্টার:
২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবারও বিশ্বজুড়ে আঘাত হানতে পারে ‘সুপার এল নিনো’। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনাটি বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সম্প্রতি জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে। সংস্থাটির পূর্বাভাস বলছে, এটির প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁতে পারে এবং আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হতে পারে।
ডব্লিউএমও’র মুখপাত্র ক্লেয়ার নালিস জানান, “২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ এল নিনো ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়বে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।”
এল নিনো কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
এল নিনো হলো এল নিনো নামে পরিচিত একটি জলবায়ু চক্র, যা মূলত মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এই ঘটনা ঘটে এবং এর প্রভাব স্থায়ী হয় প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস। এর বিপরীত পর্যায় হলো লা নিনা, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে।
বাড়তে পারে তাপমাত্রা, বদলাবে বৃষ্টিপাত
ডব্লিউএমও’র জলবায়ু পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান উইলফ্রান মুফুমা-ওকিয়া সতর্ক করে বলেন, “এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সাল হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। ২০২৪ সালের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে— হর্ন অব আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য এশিয়ায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে
অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে দেখা দিতে পারে খরা তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়তে পারে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের জন্য কী সংকেত দক্ষিণ এশিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না। আবহাওয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের গড় তাপমাত্রা বাড়তে পারে, পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। এতে কৃষি, পানি সম্পদ এবং জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা প্রায় ৬১ শতাংশ এবং এটি বছরের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাড়তি চাপ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের কারণে পৃথিবীর জলবায়ু আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এর ফলে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর প্রভাবও আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের বড় ভুক্তভোগী। তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা
২০২৪ সালে এল নিনোর প্রভাবে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর দেখেছিল। সে সময় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক সীমার কাছাকাছি।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি জরুরি।
তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুত রাখা, কৃষিতে অভিযোজনমূলক পরিকল্পনা নেওয়া, পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বাড়ানো
সতর্কবার্তা স্পষ্ট—সুপার এল নিনো শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আরও বড় সংকেত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।