শরীফ সারওয়ার: বাংলাদেশের সাগরতলের আলোকচিত্রে এক পথিকৃৎ নাম

 প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৪ অপরাহ্ন   |   জীবনের গল্প

শরীফ সারওয়ার: বাংলাদেশের সাগরতলের আলোকচিত্রে এক পথিকৃৎ নাম

বাংলাদেশের আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফির জগতে এক অনন্য ও প্রবাদপ্রতিম নাম শরীফ সারওয়ার। সমুদ্রের গভীর রহস্য, জীববৈচিত্র্য ও নাজুক বাস্তুতন্ত্রকে ক্যামেরায় ধারণ করে তিনি তৈরি করেছেন এক স্বতন্ত্র পরিচয়, যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত।

জন্ম ও ব্যক্তিজীবন:
১৯৭১ সালের ৫ মে নরসিংদীর রায়পুরায় জন্মগ্রহণ করেন শরীফ সারওয়ার। মরহুম গোলাম সারওয়ার ও সুরাইয়া বেগমের জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী ইফফাত জাহান তামান্না লিয়া এবং পুত্র শায়ান সারওয়ারকে নিয়ে তাঁর পরিবার। তবে তাঁর জীবনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সমুদ্র ও তার অজানা জগতের প্রতি গভীর অনুরাগ।

কর্মজীবনের সূচনা ও বিকাশ:
১৯৯৭ সালে সাংবাদিকতা পেশায় যাত্রা শুরু করেন শরীফ সারওয়ার। দৈনিক প্রভাত, ডেইলি নিউজ টুডে এবং প্রথম আলো-এর মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে কাজ করার পর তিনি ২০০৯ সাল পর্যন্ত দৈনিক যায়যায়দিন-এর চিফ ফটোসাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি শুধু সংবাদচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং আলোকচিত্রকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে নিরলস কাজ করেছেন।

সাংগঠনিক ভূমিকা ও স্বীকৃতি:
আলোকচিত্রের পাশাপাশি সংগঠন পরিচালনাতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ২০১৭-১৮ মেয়াদে বাংলাদেশ ফটোসাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতির হাত থেকে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি পুরস্কার এবং “ম্যান অব দ্য ইয়ার” সম্মাননা অর্জন করেন।

আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফিতে যাত্রা:
২০১২ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপে আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি শুরু করার মাধ্যমে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। শুরুতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাব থাকলেও অদম্য আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন একজন দক্ষ ডাইভার ও আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার হিসেবে।
২০২৫ সালে মালদ্বীপ থেকে আন্তর্জাতিক PADI Divemaster লাইসেন্স অর্জন তাঁর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

দেশ-বিদেশে ডাইভিং অভিজ্ঞতা:
বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন, সোনাদিয়া ও নিঝুম দ্বীপে নিয়মিত ডাইভিংয়ের পাশাপাশি তিনি থাইল্যান্ডের আন্দামান সাগর, মালয়েশিয়ার দক্ষিণ চীন সাগর এবং মালদ্বীপের প্রায় ৩০টি দ্বীপে দিনে ও রাতে অসংখ্য ডাইভ দিয়েছেন। এমনকি কাশ্মীরের ডাল লেকের নিচেও তাঁর ক্যামেরা পৌঁছেছে, যা তাঁর অনুসন্ধিৎসু মনোভাবেরই প্রমাণ।

গবেষণা ও পরিবেশ সংরক্ষণে অবদান:
শুধু আলোকচিত্র নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও গবেষণায়ও রয়েছে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউএনডিপি’র সঙ্গে তিনি কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।
২০১৩ সাল থেকে তিনি নিয়মিত সাগরতলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যা সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও প্রকাশনা:
তাঁর তোলা ছবি ও ভিডিও প্রতিবেদন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রথম আলো থেকে শুরু করে বিবিসি বাংলা-তে তাঁর কাজ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর একক প্রদর্শনী এবং “BAY OF BENGAL: Bounties Untold” প্রকাশনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
সমুদ্রকেই নিজের ঘর-সংসার মনে করা এই আলোকচিত্রী ভবিষ্যতে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক সামুদ্রিক ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা করছেন। তাঁর এই উদ্যোগ গবেষক ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যায়।


শরীফ সারওয়ার শুধু একজন আলোকচিত্রী নন; তিনি সমুদ্রের অজানা জগতের একজন নিবেদিত অনুসন্ধানী। তাঁর কাজ বাংলাদেশের আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফিকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তুলেছে এবং পরিবেশ সচেতনতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement