শেরে বাংলা (বাংলার বাঘ) এ.কে. ফজলুল হক জীবনী
ভারতীয় উপমহাদেশ ও অবিভক্ত বাংলার প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও জননেতা আবুল কাশেম ফজলুল হক, যিনি শেরে বাংলা (বাংলার বাঘ) এ.কে. ফজলুল হক নামে সমধিক পরিচিত, তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া গ্রামে ১৮৭৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মুহম্মদ ওয়াজিদ ও সায়িদুন্নিসা খাতুনের একমাত্র পুত্র। তার পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল বরিশাল শহর থেকে প্রায় ২২ কিমি. (১৩.৭ মাইল) দূরে চাখার গ্রামে। তিনি কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (১৯৩৭-১৯৪৩) এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী (১৯৫৫) এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের পদ (১৯৫৬-১৯৫৮) সহ বহু উঁচু রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
ছাত্রজীবন
থেকে অত্যন্ত মেধাবী ও বাগ্মী এই রাজনীতিবিদ ১৮৯৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত
শাস্ত্রে এম.এ. ডিগ্রি এবং ১৮৯৭ সালে কলকাতার ইউনিভার্সিটির ল' কলেজ থেকে বি.এল. ডিগ্রি
লাভ করেন। ১৯০৬ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন
এবং ১৯০৮-১৯১২ পর্যন্ত সমবায়ের সহকারী রেজিস্ট্রার পদে চাকরি করেন। এরপর সরকারি চাকরি
থেকে ইস্তফা দিয়ে শেরে বাংলা জনসেবা ও আইন ব্যবসাকে বেছে নেন। তিনি স্যার আশুতোষ মুখার্জীর
পরামর্শে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। রাজনীতিতে স্যার খাজা সলিমুল্লাহ
ও নওয়াব আলী চৌধুরীর কাছে তার হাতেখড়ি হয়। ১৯১৩ সালে তিনি ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন
পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক
প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক, সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়া ছাড়াও রাজনৈতিক
অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ১৯১৯ সালে খিলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন
এবং অসহযোগ আন্দোলনের ব্রিটিশ পণ্য ও উপাধি বর্জন কর্মসূচির প্রতি সমর্থন দান করেন।
প্রথম মন্ত্রিসভার আমলে (১৯৩৭-১৯৪১) কৃষকদের ভোগান্তি দূর করার জন্য তিনি বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল
ডেটর্স অ্যাক্ট (১৯৩৮)- (Bengal Agricultural Debtors' Act) কার্যকর করে মহাজনদের কবল
থেকে দরিদ্র কৃষকদের রক্ষা করেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের পশ্চাৎপদতা দূর করার উদ্দেশ্যে
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে শেরে বাংলা মুসলমানদের জন্য চাকরির কোটা ৫০% সংরক্ষিত
রাখার নির্দেশ দান করেন এবং শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের
গতি ত্বরান্বিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শেরে বাংলা ১৯৩৫ সালে কৃষকপ্রজা
পার্টি গঠন করেন। তার এই পার্টি জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন,
সকল দমনমূলক আইন বাতিল এবং সকল রাজবন্দি ও বিনা বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তিসহ বেশ
কয়েকটি বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল। ব্যক্তিগত ও জনজীবনে শেরে বাংলা ছিলেন অত্যন্ত সরল।
তাঁর উদার ও পরোপকারী স্বভাবের জন্য জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে জনসাধারণ তাঁকে ভালোবাসতো।
বাংলার মানুষের মুক্তি এবং অধিকার আদায়ে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের অবদান মানুষ এখনো
শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এই মহান নেতা ১৯৬২ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
চাখার বয়েজ হাই স্কুল ও ওয়াজেদ
মেমোরিয়াল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ২৭ শতক জমির উপর গড়ে উঠেছে শেরে বাংলা স্মৃতি জাদুঘর।
শেরে বাংলার স্মৃতি ও কীর্তিকে ধরে রাখার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে ১৯৮২
সালে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
চারকক্ষ বিশিষ্ট এ জাদুঘরে রয়েছে- দুটি ডিসপ্লে কক্ষ, একটি অফিস কক্ষ ও একটি লাইব্রেরি। ঢুকেই হাতের বাঁ দিকে শেরে বাংলার একটি বিশাল প্রতিকৃতি এবং তাঁর জীবনকর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। জাদুঘরে ফজলুল হকের ব্যবহৃত নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে- আরাম কেদারা, কাঠের খাট, তোষক, আলনা, ড্রেসিং টেবিল, টুল, চেয়ার-টেবিল, হাতের লাঠি, পানির গ্লাস এবং ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র। রবিবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে।