সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ: সম্ভাবনার চেয়ে অব্যবস্থাপনাই বেশি আলোচনায়
ছবি সাকলাইন আহমদ
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সবচেয়ে বড় আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। আঞ্চলিক ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়ানো, দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতার রয়েছে ব্যাপক সুযোগ। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ)। বরং আয়োজন, প্রচার, দর্শক ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক পরিকল্পনার নানা সীমাবদ্ধতা প্রতিযোগিতাটির আকর্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
২০১৮ সালের পর আট বছর বিরতি দিয়ে বাংলাদেশে ফিরেছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই ফুটবল প্রতিযোগিতা। ৫ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের আসর। এটি বাংলাদেশে সাফের চতুর্থ আয়োজন। এর আগে ২০০৩ সালে ঘরের মাঠে একবারই শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। অথচ এবারের প্রতিযোগিতাকে ঘিরে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম।
প্রশ্ন উঠছে, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হয়েও সাফ কেন প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারছে না? কেন এই আসরকে ঘিরে দর্শক আগ্রহ, বাণিজ্যিক তৎপরতা ও প্রচারণায় দৃশ্যমান ঘাটতি থাকছে?
একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট সফল করতে শুধু মাঠের লড়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সুপরিকল্পিত আয়োজন, কার্যকর বিপণন, দর্শকবান্ধব টিকিটনীতি, অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং। এবারের সাফ আয়োজনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে এসব ক্ষেত্রেই বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে আসে।
বাণিজ্যিক স্বত্ব হস্তান্তর, তদারকির দায়িত্ব কতটা পালন করেছে সাফ?
সাফের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হলেও নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনায় একটি এজেন্সিকে একচেটিয়া দায়িত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। গত ১৩ সেপ্টেম্বরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানানো হয়, ওই প্রতিষ্ঠান টুর্নামেন্টের বিপণন, সম্প্রচার, স্পনসরশিপ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। এ ক্ষেত্রে সাফ ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে।
বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা অস্বাভাবিক নয়। বরং পেশাদার কোনো এজেন্সির মাধ্যমে টুর্নামেন্টের বিপণন ও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে স্বত্ব হস্তান্তরের পর মূল আয়োজক সংস্থার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
প্রশ্ন হচ্ছে, এজেন্সিকে দায়িত্ব দেওয়ার পর সাফ নিজস্ব পর্যায়ে কতটা পরিকল্পনা করেছে? টুর্নামেন্টের ব্র্যান্ডিং, দর্শক আকর্ষণ, স্পনসর সংগ্রহ এবং বাজার সম্প্রসারণে সংস্থাটির নিজস্ব উদ্যোগ কতটা দৃশ্যমান ছিল? শুধু বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রি করাই যথেষ্ট নয়; সেই স্বত্বের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও আয়োজকদের দায়িত্ব।
ভারতীয় দলের অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা, আগাম সমন্বয়ের অভাব?
এবারের সাফ শুরুর আগে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ভারতের দল নির্বাচন। প্রতিবেশী দেশটির নিয়মিত সিনিয়র জাতীয় দল অংশ নেবে, নাকি অপেক্ষাকৃত তরুণ ও বিকল্প দল পাঠানো হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ছিল।
শেষ পর্যন্ত ভারত ২৮ সদস্যের দল ঘোষণা করলেও দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ নওশাদ মুসা। নিয়মিত সিনিয়র দলের কোচিং কাঠামো এবং প্রথম সারির খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি নিয়ে তাই আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের দুটি প্রীতি ম্যাচ থাকাও দল নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অবশ্য কোন দল পাঠাবে, সেটি ভারতের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে সাফের মতো আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় প্রতিটি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আয়োজকদের আগাম কূটনৈতিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ভারতের মতো জনপ্রিয় দলের অংশগ্রহণ টুর্নামেন্টের দর্শক আগ্রহ, সম্প্রচারমূল্য ও বাণিজ্যিক আকর্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ কারণে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে সাফের আগাম আলোচনা কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
জাতীয় প্রতিযোগিতা, আয়োজন কেন ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ?
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্য থাকলে আয়োজনের পরিধিও হওয়া উচিত বিস্তৃত। অথচ এবারের সাফের সব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে।
একটি ভেন্যুতে সব ম্যাচ আয়োজনের কিছু বাস্তব সুবিধা রয়েছে। নিরাপত্তা, যাতায়াত, সম্প্রচার ও দলগুলোর ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক সহজ হয়। কিন্তু এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ফুটবলপ্রেমীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই প্রতিযোগিতা সরাসরি উপভোগ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী কিংবা ময়মনসিংহের মতো শহরেও ফুটবলের উল্লেখযোগ্য দর্শকগোষ্ঠী রয়েছে। এসব অঞ্চলে ম্যাচ আয়োজন করা গেলে স্থানীয় দর্শকদের সম্পৃক্ততা বাড়ার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের বাজারও সম্প্রসারিত হতে পারত।
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রাখলে নতুন দর্শক তৈরির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তাই ভবিষ্যতে সাফ আয়োজনের ক্ষেত্রে একাধিক শহরকে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এটি শুধু ভেন্যু নির্বাচনের প্রশ্ন নয়, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুটবলের প্রসার ঘটানোরও একটি সুযোগ।
টিকিটের দাম কি সাধারণ দর্শকদের নাগালের বাইরে?
এবারের সাফে দর্শকদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে টিকিটের মূল্য। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৯৯ টাকা। ভ্যাটসহ তা প্রায় ১ হাজার ৭০ টাকায় দাঁড়াচ্ছে। অন্যদিকে ক্লাব হাউসের টিকিট ৩ হাজার ৯৯৯ টাকা এবং ভিআইপি গ্যালারির টিকিট ৬ হাজার ৯৯৯ টাকা।
একটি টিকিটে একই দিনের দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ রেখেছেন আয়োজকেরা। কিন্তু এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ প্রত্যেক দর্শক একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি ম্যাচ দেখতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। অনেকের আগ্রহ কেবল বাংলাদেশের ম্যাচকে ঘিরে। সে ক্ষেত্রে দুটি ম্যাচের সম্মিলিত মূল্য পরিশোধ করে একটি ম্যাচ দেখা কতটা দর্শকবান্ধব, সেটি বিবেচনার বিষয়।
টিকিটের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে দর্শকদের ক্রয়ক্ষমতা, স্থানীয় বাজার এবং প্রতিযোগিতার জনপ্রিয়তা বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে ফুটবলের সাধারণ সমর্থকদের মাঠে আনার লক্ষ্য থাকলে সাশ্রয়ী টিকিটের বিকল্প রাখা প্রয়োজন।
গত বছরের বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের টিকিট বিক্রিতে ব্যাপক চাহিদা দেখা গিয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দর্শকদের আগ্রহের প্রমাণ দেয়। কিন্তু এবারের সাফে টিকিট বিক্রিকে ঘিরে তেমন সাড়া দেখা যাচ্ছে না। এর পেছনে মূল্য নির্ধারণ কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
প্রচারণায় ঘাটতি, টুর্নামেন্ট ঘিরে নেই উৎসবের আবহ
বড় কোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতার আগে আয়োজক শহরে আলাদা উৎসবের পরিবেশ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সড়কের বিলবোর্ড, ব্যানার, ডিজিটাল প্রচারণা, খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে ভিডিও কনটেন্ট, সাবেক ফুটবলারদের সম্পৃক্ততা এবং সমর্থকদের নিয়ে নানা আয়োজনের মাধ্যমে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা হয়।
কিন্তু এবারের সাফ শুরুর আগে ঢাকায় সেই ধরনের দৃশ্যমান প্রচারণা খুব একটা চোখে পড়েনি। স্টেডিয়ামকেন্দ্রিক ব্র্যান্ডিংয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিযোগিতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও ছিল সীমিত।
টুর্নামেন্ট উপলক্ষে একটি থিম সং প্রকাশ করা হয়েছে। তবে একটি গান বা কয়েকটি প্রচারমূলক পোস্টার দিয়ে বড় প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক ও সমন্বিত প্রচারণা।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খেলোয়াড় পরিচিতি, অতীতের স্মরণীয় ম্যাচ, দেশভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দর্শকদের অংশগ্রহণ এবং ম্যাচ-পূর্ব উত্তেজনা তৈরির মতো উদ্যোগ নেওয়া যেত। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও ফুটবলপ্রেমীদের যুক্ত করার সুযোগ ছিল।
সাফকে জনপ্রিয় করতে হলে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর প্রচারণা চালানোর পরিবর্তে কয়েক মাস আগে থেকেই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে হবে।
অতিথি দলগুলোর আতিথেয়তায় প্রশ্ন, সমন্বয়ের ঘাটতি কোথায়?
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মান শুধু মাঠের প্রস্তুতি দিয়ে বিচার করা যায় না। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর আবাসন, পরিবহন, নিরাপত্তা, খাবার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও আয়োজকদের পেশাদারিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এবারের সাফে কয়েকটি দলের হোটেল ও আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ভোগান্তির খবর সামনে এসেছে। পাওয়া তথ্য ও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কয়েকটি দলের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর হোটেলে ওঠার আগে দীর্ঘ অপেক্ষার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কোথায় অবস্থান করতে হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর কোনো দলকে সাত থেকে আট ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এমন পরিস্থিতি দলের প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কা তৈরি করে।
একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে আসা দলগুলোর জন্য বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা, পরিবহন সমন্বয়, হোটেলে নিরাপদে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা আয়োজকদের মৌলিক দায়িত্ব। এসব ক্ষেত্রে আগাম পরিকল্পনা ও দায়িত্ব বণ্টন স্পষ্ট না থাকলে আয়োজনের সামগ্রিক মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ট্রফি উন্মোচন নেই, প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও হাতছাড়া
যেকোনো ফুটবল প্রতিযোগিতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতীক হলো ট্রফি। একটি টুর্নামেন্টের আগে ট্রফি উন্মোচন, ফটোশুট, সংবাদ সম্মেলন এবং সমর্থকদের সামনে ট্রফি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি করা হয়।
কিন্তু এবারের সাফ শুরুর আগের দিন পর্যন্ত ট্রফিকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো দৃশ্যমান আয়োজন চোখে পড়েনি। সংবাদ সম্মেলনেও ট্রফি প্রদর্শন ও প্রচারণার প্রত্যাশিত আয়োজন দেখা যায়নি।
ট্রফিকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ তৈরির বিষয়টি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি প্রতিযোগিতার ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমর্থকদের সামনে ট্রফি প্রদর্শন, সাবেক চ্যাম্পিয়নদের অংশগ্রহণে প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ আয়োজন করা হলে টুর্নামেন্টের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারত।
এখানে সাফ ও বাফুফের মধ্যকার সমন্বয়ের বিষয়টিও সামনে আসে। সাফের সদর দপ্তর ঢাকায় হলেও স্থানীয় আয়োজক হিসেবে বাফুফের রয়েছে জনবল, যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বণ্টন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন ছিল।
ইতিহাস ও দর্শক রয়েছে, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগছে না
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাস তিন দশকেরও বেশি সময়ের। ১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই আসরের অন্যতম আকর্ষণ।
তবে এবারের আসরে নেপাল না থাকায় ছয়টি দল অংশ নিচ্ছে। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে ভারত সর্বোচ্চ নয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। মালদ্বীপের শিরোপা দুটি। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০০৩ সালে নিজেদের মাঠে একবারই শিরোপা জিতেছিল। ২০২৩ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আসরে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল।
এই ইতিহাস, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দর্শক আগ্রহকে কেন্দ্র করে সাফের একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক ব্র্যান্ড তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল কনটেন্ট, মার্চেন্ডাইজিং, টিকিট বিক্রি এবং আন্তর্জাতিক বিপণনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতাটির আয় বাড়ানো সম্ভব।
কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রতিটি আসরকে আলাদা করে আয়োজন করার পরিবর্তে সাফের উচিত একটি ধারাবাহিক ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরি করা। যাতে টুর্নামেন্টের নাম, লোগো, প্রচারণা ও দর্শক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রতিযোগিতাটি দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের একটি পরিচিত উৎসবে পরিণত হয়।
জনপ্রিয়তার মডেল হওয়ার সুযোগ, সাফ কি পারবে ঘুরে দাঁড়াতে?
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু একটি সফল টুর্নামেন্ট আয়োজন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জনপ্রিয়তার ভিত্তি তৈরি করা। এর জন্য প্রতিটি আসরে দর্শক অভিজ্ঞতা, বাণিজ্যিক পরিকল্পনা, প্রচারণা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার উন্নতি জরুরি।
আগামীতে সাফের উচিত টিকিটের মূল্য নির্ধারণে সাধারণ দর্শকদের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া, একাধিক শহরে ম্যাচ আয়োজনের সম্ভাবনা যাচাই করা, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে আগাম সমন্বয় বাড়ানো এবং পেশাদার বিপণন কৌশল গ্রহণ করা। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দর্শকদের সম্পৃক্ত করা ও স্পনসরদের জন্য আকর্ষণীয় বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
কারণ একটি আঞ্চলিক ফুটবল প্রতিযোগিতার সাফল্য শুধু কে চ্যাম্পিয়ন হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। কত মানুষ মাঠে এলেন, কতটা আগ্রহ নিয়ে ম্যাচ দেখলেন, কতটা আলোচনায় থাকল প্রতিযোগিতাটি এবং ভবিষ্যতে এর বাণিজ্যিক মূল্য কতটা বাড়ল, সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে জনপ্রিয়তার মডেল হওয়ার মতো উপাদান সাফের রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় আঞ্চলিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়েও সাফ প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা অর্জনের সুযোগ হারাতে থাকবে।