নেপাল-চীন বন্যায় নিহত ৭৯৭, নিখোঁজ ২৭৫৯
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮০০ হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ। বুধবার হিমালয়ের নেপাল অংশে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ত্রিশূলী ও ভোতেকোশী নদীর অববাহিকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮১ হয়েছে। এদিকে তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে চীনা কর্তৃপক্ষ আরও ১৬ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।
নেপালে এখনো ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক এবং তাঁদের সঙ্গে ভ্রমণরত ১২৭ জন নেপালি নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজদের তালিকায় নেপালের সেনাবাহিনীর ৪৫ সদস্য, পুলিশের ২৭ সদস্য এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ সদস্যও আছেন।
চীনের তিব্বত অঞ্চলে ২৩টি দেশের ২৬১ বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে রোববার জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাঁদের মধ্যে নেপালের ১০৪ জন ও ভারতের ৪৯ জন রয়েছেন। এছাড়া লাটভিয়ার ৩৩, যুক্তরাষ্ট্রের ১৮, যুক্তরাজ্যের ১৫ এবং কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ছয়জন করে নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
দুই দেশের হিসাব মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ২ হাজার ৭৫৯। তবে কর্তৃপক্ষের তথ্য হালনাগাদ হওয়ায় এই সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
৯৩৩ কর্মীর খোঁজে অভিযান
নেপালের রাশুয়া ও নুয়াকোট জেলার ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট ও টানেলে কাজ করা প্রায় ৯৩৩ জন শ্রমিক এখনো নিখোঁজ বা তাঁদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এসব শ্রমিকের মধ্যে নেপাল, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের নাগরিক রয়েছেন।
Upper Trishuli-1 জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকে পড়া ২৫৪ জন শ্রমিককে উদ্ধার করেছে নেপালের সেনাবাহিনী। তবে অন্য কয়েকটি প্রকল্পে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাশুয়া জেলার ২২ মেগাওয়াট চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেল কাদায় পুরোপুরি ভরে গেছে। ফলে সেখানে উদ্ধারকারীরা এখনো ঢুকতে পারেননি। টানেলের মুখের ধ্বংসস্তূপ সরাতে কাজ চলছে এবং পাথর বেয়ে উদ্ধারকাজে দক্ষ একটি দল মোতায়েনের চেষ্টা চলছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, টানেলের ভেতরে মানুষ আটকে থাকার খবর পাওয়ার পর উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। টানেলের প্রবেশমুখ পরিষ্কার করতে ৮২ সদস্যের একটি যৌথ দল কাজ করছে। এতে সেনাবাহিনীর ৬২ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ ও নেপাল পুলিশের ২০ জন সদস্য রয়েছেন।
নেপালের পররাষ্ট্রসচিব অমৃত বাহাদুর রাই জানিয়েছেন, উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযানে ১৯ হাজার নিরাপত্তাকর্মী এবং ১৬টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। ভারতও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য চিকিৎসাকর্মী ও টানেল উদ্ধারে বিশেষজ্ঞদের একটি ১১ সদস্যের দল পাঠিয়েছে।
নতুন বন্যার আশঙ্কা
বন্যার ধ্বংসাবশেষ জমে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হওয়ায় শুক্রবার উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। হ্রদটির পানি বাড়তে থাকায় নিচের দিকে আরেক দফা বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে হওয়ায় অভিযান আবার শুরু হয়।
চীনা কর্তৃপক্ষ হ্রদটির পরিস্থিতি স্যাটেলাইট, রাডার ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করছে। হ্রদটি গিরং বন্দরের প্রায় এক কিলোমিটার উজানে। পরিস্থিতির অবনতি হলে নিচের দিকে থাকা উদ্ধারকারীদের প্রায় ৩০ মিনিট আগে সতর্ক করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রোববার ত্রিশূলী নদীতে পানির উচ্চতা আবার বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের উঁচু জায়গায় সরে যেতে হয়। একই সঙ্গে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
লাশ শনাক্তে হিমশিম
বন্যার পানিতে ভেসে আসা মরদেহ অনেক দূরের এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় মর্গগুলোতেও মরদেহ রাখার জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে। পরিচয় শনাক্ত করতে ২১টি হাসপাতালের মর্গে অজ্ঞাত মরদেহ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্ত করতে পর্যাপ্ত রেফ্রিজারেটর নেই। ডিএনএ পরীক্ষা করেও পরিচয় শনাক্ত করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
দুর্যোগে রাস্তা ও সেতুর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে জানিয়েছেন, বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা
উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় নেপাল ও চীন একসঙ্গে কাজ করছে। চীন ২ হাজার ১০০ উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে এবং ত্রাণকাজে অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় সরঞ্জাম ও ত্রাণ পৌঁছে দিতে ভারী মাল বহনে সক্ষম ড্রোন ও হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ, রেডক্রস ফেডারেশন, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ৩৬ লাখ ডলার করে মানবিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাজ্য দিয়েছে ৬৮ লাখ ডলার। জাতিসংঘ জরুরি তহবিল থেকে ২৫ লাখ ডলার ছাড় করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৩ লাখ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন ১০ লাখ ডলারের বেশি বরাদ্দের পাশাপাশি ৩১ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা