সংবাদ শিরোনাম

বেঁচে থাকতে বঞ্চনা, মৃত্যুর পরও অস্বীকৃতি—অবশেষে নিজস্ব কবরস্থানের জমি পেল তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ

 প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

বেঁচে থাকতে বঞ্চনা, মৃত্যুর পরও অস্বীকৃতি—অবশেষে নিজস্ব কবরস্থানের জমি পেল তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার, উত্তরা ডিভিশন:

ইঞ্জিনিয়ার আব্বাস উদ্দিন আশিক

সমাজের প্রান্তিক এক জনগোষ্ঠী—তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ—জীবনের প্রতিটি ধাপে যেমন অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হন, তেমনি মৃত্যুর পরও তাদের পিছু ছাড়ে না সেই বঞ্চনা। স্থানীয় কবরস্থানগুলোতে দাফনের অনুমতি না পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চরম কষ্ট ও অপমান সহ্য করে আসছিলেন তারা।

অবশেষে সেই বঞ্চনার অবসান ঘটল নাটোরের গুরুদাসপুরে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য আলাদা কবরস্থানের জমি কেনা হয়েছে। ফলে এখন অন্তত মৃত্যুর পর তারা নিজের মাটিতে শান্তিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হতে পারবেন।

সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের কুমারখালী গ্রামে গিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের দুঃখ-যন্ত্রণা ছিল অসহনীয়।


তিন বছর আগে মারা যাওয়া তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য ছোহা (৩০)-কে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে তার পরিবার তাকে নিজ গ্রামে নিয়ে গিয়ে দাফন করে। একইভাবে গুরুমাতা নদী সরকারের বাবা মৃত আহাদ আলীকেও সামাজিক কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি, কারণ তিনি ছিলেন একজন হিজড়ার বাবা। শেষ পর্যন্ত তাকে বাড়ির আঙিনায় কবর দিতে হয়।

এইসব হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা সম্প্রতি উপজেলা সমন্বয় সভায় তুলে ধরেন গুরুমাতা নদী সরকার। বিষয়টি জানার পরই মানবিক উদ্যোগ নেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ।

তার প্রচেষ্টায় উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের কুমারখালী গ্রামে ৪ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কবরস্থানের জন্য। জমিটির মূল্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। গত ৩১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে জমির দলিল গুরুমাতা নদী সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

গুরুদাসপুর উপজেলা তৃতীয় লিঙ্গ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, পুরো উপজেলায় তাদের সদস্য সংখ্যা ৪৫ জন। এর মধ্যে ২১ জন বসবাস করেন কুমারখালী গ্রামে। তাদের অধিকাংশের নেই স্থায়ী কর্মসংস্থান বা নিরাপদ আবাসন। ফলে মৃত্যুর পর দাফনের বিষয়টি ছিল তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।

নিজেদের নামে কবরস্থানের জমি পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নুপুর, সোনালী, সৌখীন, মাধবী, ইতি ও দিপারা। তারা বলেন,
“হিজড়া হয়ে জন্মানো আমাদের কোনো অপরাধ নয়। অথচ সমাজ আমাদের আলাদা করে রাখে। বেঁচে থাকতে যেমন কষ্ট, মৃত্যুর পরও তেমনি অপমান। এখন অন্তত নিজেদের মাটিতে দাফনের সুযোগ পেলাম—এটাই আমাদের জন্য বড় স্বস্তি।”

গুরুমাতা নদী সরকার বলেন,
“এতদিন আমাদের কোনো শেষ ঠিকানা ছিল না। বাবাকেও সামাজিক কবরস্থানে দাফন করতে পারিনি। আজ আমরা নিজের জায়গা পেয়েছি—এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।”

ইউএনও ফাহমিদা আফরোজ বলেন,
“মৃত্যুর পরও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের দাফনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি আমাকে ব্যথিত করেছে। অন্তত শেষ বিদায়ে তারা যেন নিজের মাটিতে ঠাঁই পান, সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, এই জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।