সংবাদ শিরোনাম

মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাসের ভয়ংকর সময় পার করছে: কাতারের আমির

 প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাসের ভয়ংকর সময় পার করছে: কাতারের আমির ছবি- সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্য এখন তার ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়গুলোর একটি’ পার করছে বলে মন্তব্য করেছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব শুধু আশপাশের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ধাক্কা পুরো বিশ্বকেই সামলাতে হচ্ছে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কাতারের আমির বলেন, এই পরিস্থিতি কারও কাছেই অপ্রত্যাশিত হওয়ার কথা নয়। বহু বছর ধরে সংকটের স্থায়ী সমাধান না করে সাময়িক ব্যবস্থা এবং বাস্তবতাবিবর্জিত নীতির ওপর নির্ভর করার ধারাবাহিক ফল হিসেবেই বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শেখ তামিম বলেন, বিরোধ মেটানোর পথ হিসেবে কাতার সব সময় সংলাপ ও আলোচনাকেই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে ন্যায়সংগত সমাধানে পৌঁছানোই হওয়া উচিত লক্ষ্য। বর্তমান পরিস্থিতির পরও কাতারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানান তিনি।

হরমুজ খুলে কূটনীতিতে ফেরার আহ্বান

কাতারের আমির মধ্যপ্রাচ্যে একটি আঞ্চলিক ‘সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান থাকতে হবে। পাশাপাশি বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে মেটানো এবং এক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপ না করার নীতিও নিশ্চিত করতে হবে।

এ ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় একটি দেশ তার প্রতিবেশীদের এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে দিতে পারে, যার সঙ্গে ওই দেশগুলোর সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই-এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, প্রতিবেশী দেশগুলো সংঘাত এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামো হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন শেখ তামিম। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ যে আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে যায়, সেটিও এখন বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথগুলো চাপ সৃষ্টি ও দর-কষাকষির হাতিয়ারে পরিণত হলে সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই-এমন দেশগুলোর মানুষকেও তার মূল্য দিতে হয়। খাদ্য ও ওষুধের দাম বেড়ে যায়, মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও জানান কাতারের আমির।

তবে এত কিছুর পরও উপসাগরীয় সংকট কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন শেখ তামিম। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালিতে আবার নৌ চলাচল চালু করা এবং যুদ্ধ এড়াতে আলোচনায় ফেরা প্রয়োজন। এর মধ্য দিয়ে ইরানসহ পুরো অঞ্চলের জন্য দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ তৈরি করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ এখনো রয়েছে এবং সেটিকে হাতছাড়া করা উচিত নয়।

গাজা নিয়েও তীব্র সমালোচনা

উপসাগরীয় সংঘাত আন্তর্জাতিক মনোযোগের বড় অংশজুড়ে থাকলেও গাজার পরিস্থিতির গুরুত্ব কমেনি বলে সতর্ক করেন শেখ তামিম। তিনি বলেন, ফিলিস্তিন যদি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাছে উপেক্ষিত থেকে যায়, তাহলে ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই।

গাজায় যা ঘটেছে, তাকে তিনি ‘সব অর্থেই গণহত্যা’ এবং মানবতার বিবেকের ওপর ‘লজ্জার দাগ’ বলে অভিহিত করেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একসময় অবাক হয়ে দেখবে-বিপর্যয়ের ব্যাপকতার তুলনায় তা থামাতে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কতটা সীমিত ছিল।

গাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার পাশাপাশি ইসরায়েলি নেতারা জনসংখ্যাকে সরিয়ে দেওয়াকেই উপযুক্ত সমাধান হিসেবে প্রকাশ্যে তুলে ধরছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ধরনের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কাতারের আমির।

ইসরায়েলি দখলদারত্বের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা বাড়লে ইসরায়েল নিজেদের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা না করে বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কখনো ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ, কখনো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং কখনো অন্য দেশ বা শক্তিকে নিজেদের ভাবমূর্তি খারাপ করার জন্য দায়ী করার প্রবণতার সমালোচনা করেন তিনি।

শেখ তামিম বলেন, ইসরায়েলি সেনারা নিজেরাই ছবি ও ভিডিওতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছে এবং গাজায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃশ্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণেরা ছড়িয়ে দিয়েছে। এসব বাস্তবতার পরও ঘটনাগুলো অস্বীকার করার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

যুদ্ধ বন্ধ ও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি

গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে ইসরায়েলকে তার শান্তির প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নে বাধ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন কাতারের আমির। তাঁর মতে, এর মধ্যে থাকতে হবে সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করা, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার, অবরোধ তুলে নেওয়া এবং কোনো শর্ত ছাড়াই মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেওয়া।

বাসিন্দাদের উচ্ছেদকে সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা পক্ষগুলো গাজার মানুষের জীবন সহজ করার যেকোনো উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

চুক্তি বাস্তবায়ন যেন মাটিতে দায়মুক্তির সুযোগ পাওয়া কোনো পক্ষের হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর না করে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বলেও মন্তব্য করেন শেখ তামিম।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন, বর্ণবৈষম্য ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের পবিত্র স্থান অবমাননার বিষয়ও তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে আল-আকসা মসজিদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। ফিলিস্তিনিদের অধিকার, বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার অস্বীকার করার বিষয়টিকেও তিনি চলমান সংকটের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

সিরিয়া ও লেবানন নিয়েও ইসরায়েলের সমালোচনা

ইসরায়েলের সিরিয়া ও লেবাননসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়েও কথা বলেন শেখ তামিম। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েলের আগ্রাসন প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার ওপর পড়ছে।

তিনি বলেন, ইসরায়েল সিরিয়ার বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটির আরও ভূখণ্ড দখল করে তা গোলান মালভূমির সঙ্গে যুক্ত করছে। গোলান মালভূমি ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েলের দখলে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

লেবাননের ক্ষেত্রেও ইসরায়েল দেশটির সঙ্গে করা সমঝোতাগুলো মানতে বাধ্য নয়-এমন অবস্থান প্রকাশ্যে জানাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কাতারের আমির। তাঁর ভাষ্য, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখল অব্যাহত রয়েছে এবং সেখানে পুলিশিংয়ের ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে।

দক্ষিণ লেবাননের পুরো গ্রাম ধ্বংসের ঘটনাকে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের অতীত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।

শেখ তামিম বলেন, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের ক্ষতি থামানো এবং বেআইনি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সত্যিই মূল্যবোধ ও আইনের শাসন রক্ষায় কতটা আন্তরিক-তার প্রকৃত পরীক্ষা।

সুদান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ার প্রসঙ্গ

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরও কয়েকটি সংকটের দিকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর দেওয়ার আহ্বান জানান কাতারের আমির। বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

সিরিয়া ও লিবিয়ার জনগণ পুনর্গঠন ও জাতীয় পুনর্মিলনের যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে কাতারের সমর্থন রয়েছে বলেও জানান শেখ তামিম।

সুদানে টেকসই শান্তির জন্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের’ আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কাতারের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ইয়েমেনের সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষেও অবস্থান জানান।

ভাষণের শেষদিকে শেখ তামিম বলেন, কাতারের মূল্যবোধ শুধু উচ্চারণ করার মতো কিছু স্লোগান নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিশ্বাস-একটি জাতির মর্যাদার সঙ্গে আপস করা যায় না এবং প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং দুটিই একই নীতির দুই দিক।

সূত্র: আরব নিউজ