হোয়াইট হাউসের প্রথা ভেঙে রানওয়েতে শি জিনপিং-কে ট্রাম্পের অভ্যর্থনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় পর মার্কিন মুলুকে পা রাখলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আর তাঁকে বরণ করে নিতে হোয়াইট হাউসের বৈঠকখানা পর্যন্ত অপেক্ষার চিরাচরিত প্রথা ভেঙে খোদ ওয়াশিংটনের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের রানওয়েতে উড়োজাহাজের সামনে হাজির হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) মার্কিন রাজধানীতে শি জিনপিংয়ের এই আগমনকে ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
দশকের বেশি সময় পর চীনের রাষ্ট্রপতির এই ঐতিহাসিক সফরকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতেই ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ। হোয়াইট হাউসের তরফ থেকে বুধবারের এই আগমনী অনুষ্ঠানের খুব বেশি বিবরণ প্রকাশ করা না হলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সেখানে উপস্থিত থাকবেন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প-এমনটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই জমকালো অভ্যর্থনার মধ্য দিয়েই শুরু হতে যাচ্ছে তিন দিনব্যাপী এক রাষ্ট্রীয় সফর, যা মার্কিন মানদণ্ডেও বেশ জাঁকজমকপূর্ণ হতে চলেছে। আগামী বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ভোজসভার মধ্য দিয়ে এই সফরের মূল পর্ব অর্জিত হবে। মূলত চলতি বছরের মে মাসে ট্রাম্পের চীন সফরকালে যে রাজকীয় কায়দায় তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল, তারই প্রতিদান হিসেবে এই জমকালো আয়োজন।
তবে ভূ-রাজনীতির এই দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যকার বাণিজ্য বিরোধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ এবং তাইওয়ানকে ঘিরে বেইজিংয়ের উচ্চাশার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে যখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, তখন এই কূটনৈতিক চাকচিক্য এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কথা বলা হলেও, ট্রাম্প যেন জিনপিংকে মুগ্ধ করতে কূটনৈতিক সব দরজায় কড়া নাড়ছেন। তিনি শি জিনপিংকে একজন "মহান নেতা" হিসেবে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং তাঁকে নিজের বন্ধু বলে সম্বোধন করে উষ্ণ সম্পর্কের কথা বলেছেন। অথচ একই সময়ে বহু গুরুতর ইস্যুতে তিনি শি জিনপিংকে কোনো রকম চাপের মুখে ফেলেননি।
এদিকে এই বিলাসবহুল অভ্যর্থনা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন সেনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান ও মিসিসিপির সেনেটর রজার উইকার। মঙ্গলবার সেনেটের ফ্লোরে দেওয়া এক ভাষণে তিনি ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, চীনা প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ওয়াশিংটনের যত জটিল সমস্যা রয়েছে, তাতে এই মুহূর্তে শি জিনপিংকে এমন আমন্ত্রণ জানানো উচিত ছিল না।
উইকার কটাক্ষ করে বলেন যে, রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় ট্রাম্পের ঠিক কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা উচিত-যেমন চীনের বিশাল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি বা ইরানের প্রতি তাদের প্রকাশ্য সমর্থনের উদ্দেশ্য। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আলোচনার প্রতি মুহূর্তেই ট্রাম্পের মনে রাখা উচিত যে তাঁর এই অতিথি একজন ক্রূর, অনির্বাচিত ও দমনমূলক স্বৈরশাসক, যিনি তাঁর প্রতিবেশীদের গ্রাস করতে চান এবং যাঁদের বিশাল সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের মূল নিশানা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
শি জিনপিংকে যে কোনো মূল্যে মোহিত করতে চান ট্রাম্প, তা তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যেই স্পষ্ট। সংবাদকর্মীদের তিনি জানিয়েছেন, এই সফরের আগেই তাঁর নতুন ও শিল্পসম্মত হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং প্যাড প্রস্তুত হওয়ায় তিনি আনন্দিত, যদিও বিশাল হোয়াইট হাউস বলরুমটি এখনো প্রস্তুত না হওয়ায় তিনি কিছুটা আক্ষেপও করেছেন।
চলতি বছরের শুরুতে বেইজিংয়ে ট্রাম্পকে যেভাবে বরণ করা হয়েছিল, এবার ওয়াশিংটনে সেই আয়োজনের প্রতিচ্ছবি ফু তুলতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও সে সময় শি জিনপিং নিজে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে যাননি, বরং তাঁর বদলে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং উপস্থিত ছিলেন। তবুও এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটি অবতরণ করার পর সেখানে বিছানো হয়েছিল এক দীর্ঘ লাল গালিচা। রানওয়ের দুই পাশে গার্ড অব অনার, সামরিক ব্যান্ড এবং প্রায় তিনশত চীনা তরুণ-তরুণী হাতে মার্কিন ও চীনা পতাকা উড়িয়ে স্লোগান দিয়েছিল, "স্বাগতম, স্বাগতম! উষ্ণ অভ্যর্থনা!" সে সময় শিশুদের পরিহিত সাদা ও হালকা নীল রঙের পোশাকগুলোর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজস্ব বিমানের ঐতিহ্যবাহী রঙের মিল ছিল।
বুধবারের বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এই আনুষ্ঠানিকতার পর বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে আরও বেশ কিছু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে, যার মধ্যে রয়েছে গার্ড পরিদর্শন। হোয়াইট হাউসের এই ব্ল্যাক-টাই ডিনারে এনভিডিয়ার জেনেসন হুয়াং এবং স্পেসএক্সের ইলন মাস্কের মতো শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তারাও উপস্থিত থাকবেন। তবে এর বাইরে দুই শীর্ষ নেতা একান্ত বৈঠকে বারি ও জটিল ইস্যুগুলোতে আলোকপাত করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এই সফর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো বড় ধরনের ঐতিহাসিক অগ্রগতির সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সফরের শেষ দিন অর্থাৎ আগামী শুক্রবার শি জিনপিং এবং তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুন হোয়াইট হাউসে ফিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডির সঙ্গে একান্ত চায়ে অংশ নেবেন। এরপর তাঁরা ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনে যাবেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সেখানে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দেয় এমন সব গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র ঘুরে দেখবেন দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা।