সংবাদ শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে জাতিসংঘে কূটনৈতিক তৎপরতা

 প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে জাতিসংঘে কূটনৈতিক তৎপরতা ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার পথ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কয়েক ঘণ্টা ধরে কূটনৈতিক তৎপরতা হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হলেও মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা সরাসরি বৈঠকে বসেছিলেন কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দিনভর মধ্যস্থতাকারীরা দুই দেশের প্রতিনিধিদলের মধ্যে যাতায়াত করে আলোচনা এগিয়ে নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আলোচনার একটি পর্ব শেষ হয়েছে, যা গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক হতে পারে বলে তাঁরা আশা করছেন। মধ্যস্থতাকারীরা কাজ চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে আরও সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন। জাতিসংঘে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিন ঘণ্টার বৈঠক করেছেন। তাঁর ভাষায়, বৈঠকটি ‘খুব ভালো’ ও ‘খুব ফলপ্রসূ’ হয়েছে। সমঝোতার দিকে ‘অনেক গতি’ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। পরে তিনি জানান, আলোচনা চলমান এবং শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

ট্রাম্পের প্রথম দিকের বক্তব্যে বৈঠকে কারা ছিলেন, তা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক কিম্বার্লি হ্যালকেট জানান, পরে হোয়াইট হাউস পরিষ্কার করে যে ট্রাম্প নিজে বৈঠকে ছিলেন না। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উইটকফ ও কুশনারই আলোচনায় অংশ নেন।

তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তৌহিদ আসাদি জানান, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও উইটকফের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাঁর প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন পক্ষের অনুরোধ ও জোরাজুরিতেই বৈঠকটি হয়েছে। আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইরানের বার্তা ও শর্তগুলো জানানো, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তেহরানের শর্তের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং ইরান যেসব এলাকাকে ‘প্রতিরোধের’ ফ্রন্ট হিসেবে উল্লেখ করে, সেসব অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ করা।

ইরানের একটি নিরাপত্তাসূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের শর্ত ও প্রতিশ্রুতিগুলো মেনে নিলে আরও কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নিউইয়র্কের এই তৎপরতার আগে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, দেশটির প্রতিনিধিদলকে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালানোর পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে তিনি ওয়াশিংটনের আলোচনায় ফেরার জন্য ‘সোনালি সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

ওই কর্মকর্তা জানান, ১৬ সেপ্টেম্বর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে নিউইয়র্কে আলোচনা হতে পারে বলেও তিনি জানান।

হরমুজ প্রণালি নিয়েও ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করেন ওই কর্মকর্তা। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে পারে তেহরান।

উত্তেজনা কমাতে সক্রিয় উপসাগরীয় দেশগুলো

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পরোক্ষ আলোচনার পাশাপাশি উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশও উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ চালাচ্ছে।

কাতার জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং পুরো অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়েও কাজ চলছে।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানির সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা এবং সংলাপের পরিবেশ তৈরির উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামুদ্রিক কূটনীতিতেও ওমান যুক্ত রয়েছে। এর আগে তেহরানের সঙ্গে প্রণালিতে নৌ চলাচল সহজ করতে সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেছে দেশটি।

মঙ্গলবার উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির সদস্য দেশগুলোর নেতা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তুরস্ক, জর্ডান, সিরিয়া ও ইরাকের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন ট্রাম্প। আলোচনায় ইরান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উঠে আসে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে কাতারের একটি প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। অঞ্চলটির একজন সূত্র জানিয়েছেন, তেহরান প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। তবে কাতার এখনো প্রস্তাবটির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।

জাতিসংঘে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পরই আলোচনা

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা পরই এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। ভাষণে তিনি একদিকে সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলেছেন, অন্যদিকে সামরিক পদক্ষেপ আরও বাড়ানোর হুমকিও দিয়েছেন।

ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং ‘ইসলামিক রিপাবলিককে নিশ্চিহ্ন’ করার পথে যাওয়া-এই দুটির মধ্যে তাঁকে একটি ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ এবং ওয়াশিংটনের ভাষায় সন্ত্রাসবাদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধের বিনিময়ে তেহরানকে ‘পূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগিতার’ প্রস্তাব দিয়েছিল।

ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাব দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ এবং খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর। ইরানের গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা ট্রাম্পের হুমকিকে ‘কৌশলগত দুর্বলতার’ প্রমাণ বলে উল্লেখ করেছে। আরও হামলা হলে ইরান তার জবাবে ‘আরও কঠোর, বিধ্বংসী ও অপ্রত্যাশিত আঘাত’ হানতে প্রস্তুত বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।

জুনে করা সমঝোতার স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলে আসছেন, দুই পক্ষের আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে। আগস্টের শুরুতে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, সম্ভাব্য একটি চুক্তির কাঠামো নিয়ে দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছেছে। পরে হরমুজ নিয়ে আলোচনাকে তিনি ‘ভালোভাবেই এগোচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেন। যদিও তখনও দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গিয়েছিল।

চলতি মাসের শুরুতেও ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি আশা করছেন যুদ্ধ ‘শেষের দিকে’ এগোচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রশ্নে তেহরানের অবস্থানে এখনো পরিবর্তন আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমাবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেবে-এ দুটিকে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে ধরে রেখেছে ইরান।

মঙ্গলবারের মধ্যস্থতাকারী-নির্ভর আলোচনার পর উইটকফ জানিয়েছেন, এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

সূত্র: আলজাজিরা