গাজা নিয়ে জাতিসংঘে ফ্রান্সের কড়া বার্তা, পাশে যুক্তরাজ্য
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গাজায় মানবিক সংকট, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সরব হয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গাজায় ত্রাণ প্রবেশে ইসরায়েলের বিধিনিষেধের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এই পরিস্থিতি গোটা বিশ্বের জন্য লজ্জার।
ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের সময় গাজা সিটির একটি এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর আসে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও সেখানে প্রাণহানি থামেনি। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের গাজা অভিযান শুরুর পর থেকে ৭৩ হাজার ৯০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও নিহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৩৯৯ জন।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, এক বছর আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সও ছিল। কিন্তু গাজার পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিষ্ক্রিয় থাকলে সেই অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
তিনি বলেন, অনেকে কথিত শান্তির কথা বলছেন, অথচ সেই শান্তির মধ্যেও গাজার জন্য এক মুহূর্তের জন্য মানবিক পথ খুলে দেওয়া হয়নি। এমন দৃশ্যের সামনে বিশ্ব কি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে-প্রশ্ন তোলেন ম্যাক্রোঁ। তাঁর বক্তব্যে ছিল, গাজার মানুষের দুর্ভোগ পুরো বিশ্বের জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও তুলে ধরেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। সেখানে ইসরায়েলের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর সতর্কবার্তা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেই ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে-এমন ধারণা ভুল। বরং এ ধরনের পদক্ষেপ আজ ও ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেই দুর্বল করবে এবং নতুন হুমকি তৈরি করবে।
ম্যাক্রোঁর সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে জাতিসংঘের অধিবেশনের এক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা এক বছর আগে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং এখন দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এগিয়ে নিতে নতুন পদক্ষেপের কথা বলছে।
বৈঠকে বার্নহ্যাম বলেন, দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে রাজনীতিকদের প্রতি মানুষের আস্থা আরও ক্ষয়ে যাবে। তাঁর ভাষায়, বহু রাজনীতিক ও সরকার কয়েক দশক ধরে এই সমাধানের কথা বলে আসছেন। কিন্তু কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকলে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা আরও কমবে।
পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যও বন্ধ করেছে যুক্তরাজ্য বলে জানান বার্নহ্যাম। তিনি ইসরায়েলের ই-১ বসতি প্রকল্পকে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ঠেকানোর একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হবে এবং পূর্ব জেরুজালেম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত ভূখণ্ড আরও খণ্ডিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বৈঠকে ফিলিস্তিনিদের জন্য ১০ কোটি কানাডীয় ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের নতুন সহায়তা ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য, এই অর্থের লক্ষ্য হলো দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাটি টিকিয়ে রাখা।
এই অর্থের ৮০ শতাংশ সরাসরি মানবিক সহায়তায় ব্যয় হবে। বাকি ২০ শতাংশ যাবে শান্তি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কাজে। এর মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য কানাডার বহু বছরের উদ্যোগও রয়েছে।
কার্নি বলেন, গাজার ফিলিস্তিনিরা এখনও ‘অত্যন্ত ভয়াবহ মানবিক দুর্ভোগের’ মধ্যে রয়েছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েল হামাস এবং ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মোকাবিলা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলের ই-১ বসতি প্রকল্পের সমালোচনা করে কার্নি জানান, অধিকৃত ভূখণ্ডের বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেবে কানাডা। কানাডাসহ ১২টি দেশ এরই মধ্যে ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে এ ধরনের বিধিনিষেধের ঘোষণা দিয়েছে।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য কানাডা ৬০ কোটি কানাডীয় ডলারের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৪২ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা ৮ সেপ্টেম্বরের এক যৌথ বিবৃতিতেও বলেছিল, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ই-১ প্রকল্প দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য সরাসরি ও জরুরি হুমকি তৈরি করছে। ওই বিবৃতিতে তিন দেশ বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং বসতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়।
জাতিসংঘের মঞ্চে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডার এই সমন্বিত অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়—ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি নিরাপদ ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ধরে রাখা।
সূত্র: আলজাজিরা