সংবাদ শিরোনাম

উদ্ধার শেষে কলম্বিয়ায় এবার পুনর্গঠনের পালা

 প্রকাশ: ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

উদ্ধার শেষে কলম্বিয়ায় এবার পুনর্গঠনের পালা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ভয়াবহ ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পর ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার তৎপরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে কলম্বিয়ায় এখন ঘরহারা মানুষকে আশ্রয় দেওয়া, জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং পুনর্গঠনের প্রস্তুতিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।

গত ১০ আগস্ট পশ্চিম কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে দেশটির ৩২টি প্রদেশের মধ্যে ১৫টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ২৮৯ জন নিহত ও ৪ হাজার ১৮৭ জন আহত হয়েছেন।

ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার শহর। এর প্রভাবে কালি, পেরেইরা ও কুইবদোর মতো শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সরকারি হিসাবে, ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৫৭টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ হাজার ৯৪৫টি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৮৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ২ হাজার ৮৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।

যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ৪০৭টি সড়ক, ৯২টি পানি সরবরাহব্যবস্থা, ৪৪টি সেতু এবং পাঁচটি বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত এক সপ্তাহে উদ্ধারকারী দলগুলোর নিরলস তৎপরতায় ৩৫৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে রোববার রাত পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ১৪৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অনলাইনে পরিচালিত অনানুষ্ঠানিক ডেটাবেস ‘কলম্বিয়া তে বুস্কা’য় নিখোঁজের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।

বোগোতা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল কালিতে উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দলের প্রধান সার্জেন্ট জোয়েল বুস্তামান্তে বলেন, গত এক সপ্তাহ প্রায় বিরতিহীনভাবে সম্ভাব্য জীবিতদের খুঁজে বের করা ও উদ্ধারে কাজ করতে হয়েছে। এখন ধ্বংসস্তূপে জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে এসেছে।

তাঁর ভাষায়, কিছু এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান আর প্রয়োজনীয় নয়। সেখানে ধ্বংসাবশেষ সরানো, ভবন ভাঙা এবং পুনর্গঠনের প্রস্তুতিসহ মাঝারি মেয়াদের জরুরি কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

কালির সাততলা ভ্যানেসা ভবনে শুক্রবার থেকে জীবিতদের খোঁজ বন্ধ রয়েছে। এখন সেখানে ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা সারেসের লজিস্টিকস প্রধান এনরিক জাপাতা।

তবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধারকর্মীদের কেউ কেউ এখনো আশা ছাড়ছেন না। ৩২ বছর বয়সী ম্যাক্সিমিলিয়ানো হেরেরা বলেন, ‘আমরা কখনো আশা হারাই না।’ তাঁর দাবি, দায়িত্বশীল দলগুলো জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপে কেউ কেউ ১৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল স্থানীয় প্রচেষ্টায় যোগ দিয়েছে।

ঘরহারা মানুষকে আশ্রয় দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

ভূমিকম্পে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঘরহারা মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার চাপ বাড়ছে। কালি ও পেরেইরার মতো শহরে স্থানীয় প্রশাসন স্টেডিয়াম ও কমিউনিটি সেন্টারকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

কালির একটি কমিউনিটি হলে ভেরোনিকা এচেভেরি পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার, পানি, পোশাক ও পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণ করা হচ্ছে। নাগরিক, হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় জরুরি প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে বড় শহরগুলোর আশ্রয়কেন্দ্রে চাহিদা তুলনামূলক কম। এচেভেরি জানান, ঘর হারানো অনেক মানুষ পরিবার ও বন্ধুদের কাছে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। ১১টি শয্যার ওই আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে মাত্র দুজন অবস্থান করছেন।

তবে পরিস্থিতি ভিন্ন দরিদ্র ও দুর্গম এলাকাগুলোতে। কলম্বিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ চোকোতে ভূমিকম্পের আঘাত এসেছে আগে থেকেই চলা নানা সংকটের ওপর।

অ্যাকশনএইডের কলম্বিয়া পরিচালক এগিদো সানজ বলেন, সেখানে ভূমিকম্পের সংকটের সঙ্গে আগে থেকেই থাকা বড় সংকট যুক্ত হয়েছে। চোকোতে সশস্ত্র সংঘাত, মাদক পাচার ও অবৈধ সোনার খনির সমস্যা দীর্ঘদিনের।

প্রাদেশিক রাজধানী কুইবদো সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষেরও আশ্রয়স্থল। প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের এই শহরে ২ হাজার ৭২৩টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৩৭টি এখন বসবাসের অনুপযোগী।

স্থানীয় বাসিন্দা ইয়িলসন মারমোলেহো অভিযোগ করেন, অস্থায়ী বা স্থায়ী আশ্রয় তৈরিতে জাতীয় পর্যায়ে সরকারের তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দেখা যায়নি।

চোকোর বিস্তীর্ণ অংশে নদীপথ ছাড়া যাতায়াতের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সেখানে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। সানজ বলেন, কিছু এলাকায় কী ঘটেছে, তা এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি।

ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধাক্কা

ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে কলম্বিয়ার অর্থনীতিতেও। বুয়েনাভেনতুরার ৬৫ বছর বয়সী নেস্তর মার্তিনেজ ২৫ বছর ধরে সাইকেলের দোকান চালাচ্ছেন। ভূমিকম্পে তাঁর দোকানের ছাউনি ও দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে পণ্যও।

গত এক সপ্তাহ ধরে ধ্বংসাবশেষ সরানোর পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছেন মার্তিনেজ। তাঁর হিসাবে, দোকানটি মেরামতে প্রায় ৩৫ কোটি কলম্বিয়ান পেসো, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হতে পারে।

তাঁর কোনো ব্যবসায়িক বিমাও নেই। মার্তিনেজ বলেন, আবার দাঁড়াতে হলে যেভাবেই হোক অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও সহায়তা আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০ লাখ ইউরো বা প্রায় ২৩ লাখ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।

প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা পুনর্গঠন তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশটির অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের ক্ষতি কমপক্ষে ৬৪০ কোটি ডলার হতে পারে।

সরকার অর্থ সংগ্রহে নতুন কর আরোপের ক্ষমতা দিতে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও প্রেসিডেন্ট আপাতত ঋণের পথ বেছে নিয়েছেন। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ৪৫ কোটি ডলারের ঋণসুবিধাও রয়েছে।

ভূমিকম্পটি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন দিন পর প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েলার সরকারের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

তাঁর সরকার ইসরায়েল, এল সালভাদর ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল গ্রহণে আগ্রহ দেখানোয় এ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।

দেশটি এখন দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার দিকে এগোলেও ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকারীদের কাজ পুরোপুরি থামেনি। সার্জেন্ট বুস্তামান্তের ভাষায়, জীবিতদের খোঁজ এখনো চলছে-আর সেখানে ‘অলৌকিক কিছু’ ঘটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সূত্র: আলজাজিরা