শ্রীপুরের ভোটে উন্নয়নের চেয়ে বড় প্রশ্ন সুশাসন ও জবাবদিহি

 প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৫০ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

শ্রীপুরের ভোটে উন্নয়নের চেয়ে বড় প্রশ্ন সুশাসন ও জবাবদিহি

রতন প্রধান, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় যে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা কোনো দলীয় অভিযোগের ভাষা নয়, এটি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। ঘুষ–দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সর্বত্র দলীয়করণ এবং মাদকের বিস্তার- এই পাঁচটি সংকট আজ শ্রীপুরের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

রাজনীতির ছত্রছায়ায় পদ–পদবী বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, বাজার সিন্ডিকেট ও তদবির বাণিজ্য কার্যত একটি সমান্তরাল অর্থনীতি ও ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছে। আইনের শাসন এখানে ব্যতিক্রম, আর প্রভাবশালী মহলের স্বার্থই যেন নিয়ম। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিত্বের মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে, যার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ নাগরিক।

শিল্পাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা শ্রীপুরে উন্নয়নের দৃশ্যমান কিছু চিহ্ন থাকলেও, সেই উন্নয়নের সুফল ন্যায়ভিত্তিক নয়, বরং দলীয় আনুগত্যনির্ভর। থানায় ন্যায়বিচার, সরকারি দপ্তরে সেবা কিংবা বাজারে ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই দলীয় পরিচয় হয়ে উঠেছে অলিখিত যোগ্যতা। এতে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো মাদকের অবাধ বিস্তার। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মাদক কারবারিরা আরও সংগঠিত ও বেপরোয়া হয়েছে। তরুণ সমাজ ধ্বংসের মুখে, অথচ নির্বাচনী বক্তৃতায় মাদকবিরোধী অবস্থান উচ্চারিত হলেও বাস্তব কার্যকর উদ্যোগের নজির বিরল।

এই প্রেক্ষাপটে শ্রীপুরে নির্বাচনী প্রচারণা দিন দিন সরগরম হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন হাট–বাজার, শিল্পাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদে প্রার্থীদের গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠকে ভোটের আমেজ দৃশ্যমান। ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ে প্রার্থীরা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও আইনের শাসনের কথা বলছেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঠপর্যায়ে প্রচারণা ও জনসম্পৃক্ততার দিক থেকে বিএনপি প্রার্থী তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের জবাবদিহি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং মাদক ও চাঁদাবাজি দমনের প্রতিশ্রুতি বিএনপি প্রার্থীর প্রচারণায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মত অনেকের। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও শেষ মুহূর্তে ভোটের সমীকরণ বদলের চেষ্টায় সক্রিয় রয়েছেন।

এই বাস্তবতায় শ্রীপুরের ভোটাররা আর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে সহজে আশ্বস্ত হতে চাইছেন না। তাদের চাওয়া স্পষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তারা চান এমন জনপ্রতিনিধি, যিনি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে দৃঢ় থাকবেন, দলীয় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখবেন।

ভোটারদের ভাষায়, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তার সঙ্গে থাকে সুশাসন ও আইনের শাসন। নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ না হলে কর্মসংস্থান কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে দ্রব্যমূল্যের চাপ সাধারণ মানুষের কাঁধেই থেকে যাবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শ্রীপুরের জন্য কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র। এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে, জনপ্রতিনিধিত্ব কি আবারও ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ থাকবে, নাকি জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী জবাবদিহিমূলক রাজনীতির পথে হাঁটবে।

শ্রীপুরের ভোটাররা এবার দলীয় স্লোগানের বাইরে এসে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, এই দেশ কি অবশেষে ঘুষ–দুর্নীতি ও দলীয় দখলদারিত্বের রাজনীতি থেকে মুক্তির পথে যাবে? সেই উত্তরই দেবে আগামী নির্বাচন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement