হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ তিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিকরা আটক
ছবি -সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার হারিয়েছে শীর্ষস্থানীয় তিন গণমাধ্যম-সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকো। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) এই তিন নেটওয়ার্কের সাংবাদিক ও প্রতিনিধিরা হোয়াইট হাউস চত্বরে ঢুকতে গেলে তাদের আটকে দেওয়া হয় এবং বাধা সৃষ্টি করা হয়। এর একদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে 'উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নেতিবাচক খবর প্রচারের' অভিযোগ তুলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
শনিবার সকাল আটটার ঠিক পরপরই একটি বিবৃতি প্রকাশ করে এমএস নাও জানায়, তাদের সংবাদকর্মীদের হোয়াইট হাউস চত্বরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, হোয়াইট হাউস মার্কিন সাধারণ মানুষের এবং এর ভেতরে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্তের পেছনে জনগণের ট্যাক্সের টাকাই খরচ হয়। গণতন্ত্রে স্বাধীন সাংবাদিকতার অপরিহার্য ভূমিকা ও প্রথম সংশোধনী প্রদত্ত অধিকার রক্ষায় যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর তারা।
এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর সকাল ১০টার দিকে সিএনএনও তাদের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস চত্বরে প্রবেশে বাধা পাওয়ার খবরটি নিশ্চিত করে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের এই পদক্ষেপকে একটি 'অবৈধ আক্রমণ' বলে কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে তারা। সিএনএন জানায়, হোয়াইট হাউস কিংবা অন্য কোনো সরকারি ভবনে শারীরিক প্রবেশাধিকার সীমিত করার বা সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো চেষ্টা সত্ত্বেও মার্কিন সরকারের ওপর সংবাদ প্রচারের তাদের মিশন অব্যাহত থাকবে। সরকারের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বাধা ছাড়াই খবর সংগ্রহের সাংবিধানিক অধিকার তাদের রয়েছে।
এর কিছু সময় পর পলিটিকোর সকালের নিউজলেটার 'পলিটিকো প্লেবুক'-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সম্পাদক জোনাথন গ্রিনবার্গের একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেখানে এক সংবাদকর্মীকে হোয়াইট হাউসে ঢুকতে না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। গ্রিনবার্গ জানান, তার সহকর্মী শায়েন হ্যাজলেট পলিটিকোর সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য হোয়াইট হাউসে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সিক্রেট সার্ভিস তাকে চত্বরে ঢুকতে বাধা দেয় এবং হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পাসটি জব্দ করে। নিউজরুমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে এই ঘটনা তুলে ধরা হয়।
এর আগে শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস চত্বরে নিষিদ্ধ করার কথা জানান। প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসন সম্পর্কে মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ এনে তিনি অবিলম্বে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ঘোষণা দেন। ট্রাম্প লিখেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্প প্রশাসন কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্টের খবর প্রচার করার সময় সংবাদমাধ্যমগুলোর অবিরত মিথ্যা ও কল্পকাহিনি লেখার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি সংবাদ সংস্থাকেও নিষিদ্ধ করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
শনিবার সকালে কাজ করার জন্য হোয়াইট হাউসে পৌঁছানোর পর এমএস নাও-এর সংবাদদাতা আকায়লা গার্ডনার দেখতে পান যে তার প্রেস কার্ডটি অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। চত্বরের বাইরে থেকেই তিনি এই পরিস্থিতির লাইভ প্রতিবেদন দেন। তিনি জানান, প্রাথমিক নিরাপত্তা তল্লাশি পার হলেও যখনই তিনি কার্ড স্ক্যান করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন, তখনই হোয়াইট হাউসের কর্মীরা তাকে থামিয়ে দেন।
গার্ডনারের ভাষ্য অনুযায়ী, কার্ডটি কাজ করেনি এবং সেখানে লাল রঙের একটি বাতি জ্বলছিল। এরপর এক কর্মকর্তা তার ব্যাজটি নিয়ে নেন এবং জানান যে এটি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা তাকে জানান যে এই সিদ্ধান্ত তার ক্ষমতার বাইরে। তার হোয়াইট হাউসের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড কেড়ে নেওয়া হলেও একজন প্রোডিউসারের পাস তখনো সচল ছিল বলে জানান গার্ডনার।
ফক্স নিউজের কন্ট্রিবিউটরসহ একাধিক মুক্তবাক ও গণমাধ্যম সংগঠন এই নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পরপরই এমএস নাও, সিএনএন এবং পলিটিকো প্রত্যেকেই এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয় এবং এই বিধিনিষেধের কড়া নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করে।
সিএনএন-এর সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ দীর্ঘদিনের। গত জুনে ওভাল অফিসের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই নেটওয়ার্ককে 'অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত' বলে আক্রমণ করেছিলেন। এমনকি একই বৈঠকে সিএনএন-এর হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা কেইটলান কলিন্সকে 'চোখে ঘৃণা নিয়ে চলা দুর্নীতিগ্রস্ত রিপোর্টার' বলে কটূক্তি করেছিলেন তিনি। সিএনএন-এর একজন মুখপাত্র বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারের ওপর সরাসরি বেআইনি আক্রমণ হবে।
পলিটিকোর বিবৃতিতে জোনাথন গ্রিনবার্গও এই নিষেধাজ্ঞার সাংবিধানিক দিক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, হোয়াইট হাউস কাভার করা সেই নারী সাংবাদিক এবং বাকি সবার পাশেই তারা রয়েছে। বাকস্বাধীনতা রক্ষায় তারা নিজেদের প্রথম সংশোধনীর অধিকার জোরালোভাবে রক্ষা করবেন।
এদিকে পলিটিকোকে তাদের 'পলিটিকো প্রো সাবস্ক্রিপশন'-এর জন্য আট মিলিয়ন ডলার সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন ট্রাম্প। তবে পলিটিকো কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিয়েছে। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পলিটিকো সরকারি ভর্তুকি পায়নি-এই ধরনের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ইতিমধ্যে তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।
শনিবারের এসব ঘটনার পর হোয়াইট হাউস করসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউএইচসিএ) প্রেসিডেন্ট জ্যাকি হেইনরিখ একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এই পদক্ষেপ সরাসরি প্রথম সংশোধনীর পরিপন্থী এবং ডব্লিউএইচসিএ প্রশাসনকে অবিলম্বে তাদের সহকর্মীদের প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
হেইনরিখ লিখেছেন, এর প্রভাব কেবল এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে যেকোনো সংবাদমাধ্যমকে তাদের রিপোর্টিংয়ের কারণে বাদ দেওয়ার এই মানদণ্ড অন্য সবার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হতে পারে। সরকারের দায়িত্বশীলদের সমালোচনা করার অধিকার স্বাধীন গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমেরিকার জনগণের রয়েছে, তা সে সরকারি কর্মকর্তারা ইতিবাচকভাবে দেখুক বা না দেখুক। আদালত বারবার এই কথাই বলেছে যে, হোয়াইট হাউস একবার সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার দিলে খেয়ালখুশি মতো বা খবরের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
সূত্র: দ্য হিল