ইমরানের মামলা ফিক্সিং নিয়ে সাংবিধানিক আদালতের সঙ্গে টানাপোড়েন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইমরান খানের হাসপাতালে স্থানান্তরসংক্রান্ত মামলাগুলো ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্টে (এফসিসি) শুনানির জন্য নির্ধারণের নির্দেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) আদালত বলেছে, এ বিষয়ে নিজেদের শুনানি তিন সপ্তাহের পর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সাংবিধানিক শিষ্টাচারের স্বার্থেই বর্তমান কার্যক্রম স্থগিত রাখা প্রয়োজন।
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে হাসপাতালে স্থানান্তর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চলমান মামলাগুলোর নথি চেয়ে মঙ্গলবার নির্দেশ দিয়েছিল এফসিসি। সংবিধানের ১৭৫-ই অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিজেদের আদালতে শুনানির জন্য নির্ধারণ করতে নির্দেশ দেয় তারা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আদিয়ালা কারাগারে থাকা তিন বন্দি ইমরান খানকে দেওয়া একই ধরনের সুবিধা পাওয়ার আবেদন করার পর এফসিসি এই নির্দেশ দেয়। গত ১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট এক অন্তর্বর্তী আদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইমরান খানকে ইসলামাবাদের বেসরকারি হাসপাতাল শিফা ইন্টারন্যাশনালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিল।
বুধবার বিচারপতি শহীদ ওয়াহিদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চে বিষয়টির শুনানি হয়। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি নাঈম আখতার আফগান ও বিচারপতি ইশতিয়াক ইব্রাহিম।
শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল ফর পাকিস্তান (এজিপি) মনসুর উসমান আওয়ানকে বিচারপতি শহীদ ওয়াহিদ বলেন, এফসিসির ১৫ সেপ্টেম্বরের আদেশের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে মামলাগুলো ওই আদালতে শুনানির জন্য নির্ধারণ করার যে কথা বলা হয়েছে, সেটিই তাঁদের উদ্বেগের জায়গা।
বিচারপতি ওয়াহিদ বলেন, সুপ্রিম কোর্ট থেকে নথি চেয়ে নিয়ে মামলাগুলো এফসিসিতে শুনানির জন্য নির্ধারণ করা সংবিধানের ১৭৫-ই অনুচ্ছেদের ৫ নম্বর ধারার আওতায় পড়ে না।
সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৭৫-ই অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এফসিসি কোনো মামলার নথি তলব করতে পারে এবং সংবিধান-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মনসুর উসমান আওয়ান বলেন, বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এরপর সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চও স্বীকার করে, পরিস্থিতিটি নজিরবিহীন। কারণ সাধারণত এফসিসি উচ্চ আদালতগুলোর কাছ থেকে মামলার নথি তলব করে থাকে। সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে এভাবে নথি চাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম।
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে, গত ১৮ আগস্ট ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা কোনো পক্ষের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্বধারণা তৈরি না করেই দেওয়া হয়েছিল।
শুনানিতে এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল স্বীকার করেন, ১৮ আগস্টের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে আবেদনকারীর আইনজীবী ওই আদেশের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দেননি।
বিচারপতি ওয়াহিদ আবেদনকারীদের বলেন, ১৮ আগস্টের আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি অ্যাটর্নি জেনারেলের ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন আদালত। শুনানি শুরুর সময় অবশ্য এজিপি আদালতকক্ষে ছিলেন না। এ সময় আদালতকক্ষ নম্বর ৫ পুরোপুরি ভর্তি ছিল, কিন্তু কোনো আইন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
পরে আদালত এজিপি আওয়ানকে হাজির হতে বলে। প্রথমে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল রানা আসাদুল্লাহ খান আদালতে আসেন এবং ১৫ সেপ্টেম্বর এফসিসির দেওয়া নির্দেশ পড়ে শোনান। ওই নির্দেশে সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে মামলার নথি চেয়ে এফসিসিতে পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল।
এরপর সুপ্রিম কোর্ট কিছুক্ষণের জন্য মুলতবি হয়ে এজিপি আওয়ানকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। প্রায় ৩৫ মিনিট পর তিনি আদালতে পৌঁছালে বেঞ্চ জানতে চায়, এফসিসির ১৫ সেপ্টেম্বরের আদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক কি না।
জবাবে এজিপি বলেন, সংবিধানের ১৭৫-ই অনুচ্ছেদের ৫ নম্বর ধারা প্রয়োগ করেই এফসিসি ওই নির্দেশ দিয়েছে। ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও এফসিসির এখতিয়ারের ক্ষেত্রগুলোও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিচারপতি শহীদ ওয়াহিদ এরপর এফসিসির মঙ্গলবারের আদেশে উত্থাপিত চারটি প্রশ্ন পড়ে শোনান। এগুলো হলো-সংবিধানের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের এখতিয়ার ও সক্ষমতা কোন কোন আদালতের রয়েছে; সংবিধান ও ১৯৭৮ সালের পাকিস্তান প্রিজন রুলস অনুযায়ী বন্দিদের কী কী অধিকার দিতে হবে; বন্দিদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বের পরিধি কতটা; এবং রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা বন্দিদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করলে তার কী পরিণতি হতে পারে।
বিচারপতি ওয়াহিদ বলেন, যদি মৌলিক অধিকারই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়, তাহলে দেওয়ানি, ফৌজদারি কিংবা চাকরিসংক্রান্ত-প্রায় সব মামলাতেই মৌলিক অধিকার কোনো না কোনোভাবে জড়িত থাকে। সংবিধানের ১০-এ অনুচ্ছেদে থাকা ন্যায্য বিচারের অধিকারও প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত নীতির ভিত্তিতে বন্দিদের যেকোনো প্রতিকার দেওয়ার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে। এফসিসির এমন এখতিয়ার নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে অ্যাটর্নি জেনারেল আওয়ান পাল্টা যুক্তি দেন, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ-সংক্রান্ত প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের শরিয়ত আপিল বেঞ্চের রয়েছে।
বিচারপতি নাঈম আখতার আফগান বলেন, ১৫ সেপ্টেম্বরের এফসিসির আদেশের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের পরিপ্রেক্ষিতে এখন সুপ্রিম কোর্ট কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, সেটিই বেঞ্চের মূল উদ্বেগ। তিনি বলেন, দুটি প্রতিষ্ঠানকেই পাশাপাশি কাজ করতে হবে এবং উভয়ের নিজস্ব এখতিয়ার রয়েছে। এফসিসি মামলার নথি তলব করতে পারে-এ বিষয়টি নিয়ে আপত্তি নেই; তবে এরপর মামলাগুলো এফসিসিতে শুনানির জন্য নির্ধারণ করা নিয়ে বেঞ্চের আপত্তি রয়েছে।
শুনানিতে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ আলী জাফর বলেন, মামলার স্থানান্তরের বিষয়টি এখতিয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। সংবিধানের ১৭৫-ই অনুচ্ছেদের ৫ নম্বর ধারার মাধ্যমে কারও এখতিয়ার কেড়ে নেওয়া বা নতুন করে এখতিয়ার দেওয়ার প্রশ্নও এখানে নেই বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, চিকিৎসক উজমা খানের পক্ষে আইনজীবী উজাইর কারামত ভান্ডারি তাঁর মক্কেলের আবেদনের বিষয়ে আদালতের কাছে অন্তত এমন নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করেন, যাতে কারাগারে থাকা ইমরান খানের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা সাক্ষাৎ করতে পারেন। আবেদনে ১৮ আগস্টের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আদালতের লিখিত আদেশে বলা হয়েছে, মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে সঠিক পথ নির্ধারণে অ্যাটর্নি জেনারেলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এফসিসির আদেশ সুপ্রিম কোর্টের চলমান কার্যক্রমের ওপর কতটা বাধ্যতামূলক, সে বিষয়ে তাঁর মতামত চেয়েছে বেঞ্চ।
আদালত বলেছে, দেশের দুই সর্বোচ্চ বিচারিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পরিস্থিতি তৈরি না করা এবং একই সঙ্গে বিচারিক সৌজন্যের চেতনা বজায় রাখার জন্য এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল তিন সপ্তাহ সময় চান। পরে সুপ্রিম কোর্টও তিন সপ্তাহ পর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করার সিদ্ধান্ত নেয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, সংবিধানের চেতনা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট কোনো বিচারিক আদেশ উপেক্ষা করতে পারে না। সেই কারণে বর্তমান মামলার শুনানি পিছিয়ে দেওয়া প্রয়োজন বলে আদালত মনে করেছে।
সূত্র: ডন