মক্কায় ড্রোন হামলার অভিযোগ, হুতিদের কড়া হুঁশিয়ারি সৌদির
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে পবিত্র নগরী মক্কা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগ তুলেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। বুধবার জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মক্কার দিকে আসা একটি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে। ঘটনাটি ঘিরে মুসলিম বিশ্বে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে এএফপি। একই সঙ্গে ইয়েমেনকে ঘিরে চলমান সংঘাতও আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে সৌদি আরবের এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হুতিরা। সংগঠনটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সৌদি দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর ভাষ্য, মক্কা লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ আগেও করা হয়েছে এবং এটি এখন ‘পুরোনো মিথ্যা’, যা দিয়ে আর কাউকে বিভ্রান্ত করা যাচ্ছে না।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অবশ্য বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। জোটের মুখপাত্র তুরকি আল-মালিকির মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, পবিত্র দুই মসজিদ ও সেখানে থাকা মুসল্লিদের নিরাপত্তা তাদের কাছে ‘লালসীমা’। হুতিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে জোটের যৌথ বাহিনীর কমান্ড কোনো দ্বিধা করবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
মক্কায় হামলার অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসি। ৫৭টি মুসলিম দেশের এই জোট ঘটনাটিকে ‘জঘন্য’ হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মঙ্গলবার সৌদি কর্তৃপক্ষ মক্কা এবং ইয়েমেন সীমান্তবর্তী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য হামলা নিয়ে সংক্ষিপ্ত সতর্কবার্তা জারি করেছিল। ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মক্কাকে ঘিরে এটিই ছিল প্রথম সতর্কবার্তা। এর এক দিন আগে ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে দফায় দফায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ১৩ জন আহত হন।
ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাতও নতুন করে তীব্র হয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বহু বছর ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখা হুতিরা জুলাইয়ে ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। গত সপ্তাহের দ্রুতগতির অভিযানে তারা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব আল-মানদাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে।
বাব আল-মানদাব সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল যখন সংকটে পড়েছে, তখন বাব আল-মানদাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সৌদি জাহাজ ছাড়া বাব আল-মানদাব দিয়ে অন্য জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো হুমকি নেই। তবে এই জলপথে হামলা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনকারীদের কাছে রুটটি কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এর প্রভাব সৌদি আরবের বাইরেও পড়তে পারে। লোহিত সাগরই সুয়েজ খালের প্রবেশপথ হওয়ায় বাব আল-মানদাবের নৌ চলাচল ব্যাহত হলে মিসরের অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়তে পারে। সুয়েজ খাল থেকে পাওয়া রাজস্ব দেশটির বৈদেশিক আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ২০২৩ সালে হুতিরা লোহিত সাগরের জাহাজে হামলা শুরু করার আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে খালটির আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। হুতিদের দাবি ছিল, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাতেই তারা ওই অভিযান শুরু করেছিল।
মঙ্গলবার কাতার সতর্ক করে বলেছে, বাব আল মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে এর পরিণতি ভয়াবহ হবে এবং তা ‘পুরো বিশ্বের জন্য বিপর্যয়কর’ হতে পারে।
হুতিরা সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা এসব হামলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। জোটের ভাষ্য, হুতিদের ‘শত্রুতাপূর্ণ ও উগ্র’ কর্মকাণ্ড ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি মঙ্গলবার দাবি করেন, আগের ২৪ ঘণ্টায় সৌদি আরব ইয়েমেনে ৫২টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এসব হামলায় স্কুল ও সেতুসহ বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্য করা হয়েছে।
তবে সৌদি বিমান হামলা এখন পর্যন্ত হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি বাহিনীকে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক টাস্কফোর্স গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সামরিক পরিকল্পনায় সহায়তা বাড়ানোর কাজ করছে বলে মঙ্গলবার এএফপিকে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা।
এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মক্কাকে লক্ষ্য করে কথিত ড্রোন হামলার প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, পবিত্র স্থানে এমন হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের জনগণ গভীরভাবে মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন। সৌদি বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ ও সতর্কতার প্রশংসা করে তিনি সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানান।
শাহবাজ শরিফ আরও বলেন, সংঘাতে অঞ্চলটি ইতিমধ্যেই অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; শান্তির টেকসই পথ হিসেবে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দেন তিনি। সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং মক্কা-মদিনাসহ পবিত্র দুই মসজিদের নিরাপত্তার প্রশ্নে পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এমন কর্মকাণ্ড সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন, বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
ইয়েমেনে ২০২২ সাল থেকে অনেকটা স্থবির থাকা গৃহযুদ্ধ নতুন করে জ্বলে ওঠায় সৌদি আরবও দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়ার পথে এগোচ্ছে। এরই মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি মঙ্গলবার কায়রোতে বৈঠক করে হরমুজ ও বাব আল মান্দেব-দুই প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছিল, সৌদি যুবরাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেছিলেন। তবে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের কারণে ৮২ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘে ইয়েমেনের স্থায়ী প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল-সাদি বলেছেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় ‘জাতীয় প্রতিষ্ঠান’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ইয়েমেনিরা লড়াই করছে। হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: ডন