লারাকে মার্কিন হামলার জবাবে জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। সোমবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এ দাবি করেছে। এর মধ্য দিয়ে ছয় মাসের যুদ্ধে আবারও সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
আইআরজিসি জানিয়েছে, জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর উৎস সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি আম্মান।
এর এক দিন আগে রোববার হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে ইরানের দুটি রকেট উৎক্ষেপণযন্ত্রে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড যাতে হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে সমুদ্র মাইন পেতে না পারে, সে জন্য ওই হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে মার্কিন বাহিনীর জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করছিল আইআরজিসির একটি ইউনিট। তাদের লক্ষ্য করে সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় হতাহত হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের ভাষায়, এটি ছিল ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাব’।
আবার উত্তপ্ত সংঘাত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মাত্রা কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা এবং এর পরদিন জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও তাদের মিত্রদের বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে এরই মধ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সেন্টকম জানিয়েছে, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথ থেকে সমুদ্র মাইন সরানোর কাজ শেষ করেছে তারা। তবে ওই এলাকায় জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সামরিক হামলার বদলে নিষেধাজ্ঞায় জোর
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সামরিক হামলার পরিবর্তে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিল। তবে লারাক দ্বীপে নতুন হামলা এবং জর্ডানে ইরানের পাল্টা আঘাত সেই কৌশলের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রোববার রয়টার্সকে বলেছেন, ইরানের ওপর নতুন করে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। প্রতি সপ্তাহেই নতুন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। শুরুতে ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য করা হবে বলে জানান বেসেন্ট।
গত শুক্রবার ইরানের সঙ্গে আর্থিক যোগাযোগের অভিযোগে মিসরের ব্যাংক মিসরের সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক শাখাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বেসেন্ট বলেন, পরবর্তী ধাপে কোনো প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা ব্যাহত
ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তান ও কাতারসহ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও জুনে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে তীব্র লড়াই কমে এলেও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিচ্ছিন্ন হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এর আগে ২৯ জুলাই ইরানে সর্বশেষ হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, ওই হামলা অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের আকস্মিক হামলার চেষ্টার জবাবে চালানো হয়েছিল।
নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। মার্কিন হামলার খবরের পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দামও ৮৫ ডলারের বেশি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি নিয়ে জনমতও বিভক্ত। নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর জ্যাক রিড সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেছেন, ছয় মাস পরও যুদ্ধের কোনো লক্ষ্য অর্জিত হয়নি; বরং মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।