পরীক্ষা চলাকালীন স্কুলে বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডব: পশ্চিম তীরে কিশোরসহ নিহত ২

 প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৩ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

পরীক্ষা চলাকালীন স্কুলে বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডব: পশ্চিম তীরে কিশোরসহ নিহত ২

ডেক্স নিউজ:

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা সংলগ্ন আল-মুঘাইয়ির গ্রামে একটি স্কুলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ভয়াবহ হামলায় এক ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীসহ দুইজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) পরীক্ষার হল থেকে পালানোর সময় এবং শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে তারা গুলিবিদ্ধ হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো পশ্চিম তীরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

রক্তাক্ত শ্রেণিকক্ষ: যেভাবে শুরু হামলা

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, মঙ্গলবার সকালে শিক্ষার্থীরা যখন তাদের মাসিক পরীক্ষা দিচ্ছিল, তখন নিকটস্থ পাহাড়ের অবৈধ বসতি থেকে একদল সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী নিচে নেমে আসে। তারা অতর্কিতভাবে স্কুল ভবন লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাসাম আবু আসাফ সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, "হঠাৎ গুলির শব্দে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আমরা শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচাতে মেঝেতে শুয়ে পড়ার নির্দেশ দিই। বাচ্চারা ভয়ে কাঁদছিল।"

 নিহতদের পরিচয় ও বীরত্ব

এই হামলায় নিহতরা হলেন:আওস হামদি আল-নাসান (১৪):* নবম শ্রেণীর এই শিক্ষার্থী স্কুল থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়ানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়। মর্মান্তিক বিষয় হলো, ২০১৯ সালেও আওসের বাবা হামদি আল-নাসান একইভাবে বসতি স্থাপনকারীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন। 

জিহাদ মারজুক আবু নাইম (৩২):* তিনি কোনো শিক্ষার্থী ছিলেন না, তবে গুলির শব্দ শুনে আতঙ্কিত শিশুদের উদ্ধার করতে স্কুলে ছুটে গিয়েছিলেন। শিশুদের রক্ষা করতে গিয়েই তিনি ঘাতকের বুলেটের শিকার হন।

 সেনাবাহিনীর দাবি বনাম প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, একটি ইসরায়েলি বেসামরিক গাড়িতে পাথর ছোড়ার খবর পেয়ে তাদের রিজার্ভ সৈন্যরা সেখানে যায় এবং 'সন্দেহভাজনদের' লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল প্রশাসন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।স্কুলের প্রশাসক ঘানেম নাসান এবং মেয়র আমিন আবু আলিয়া জানান, সৈন্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা বসতি স্থাপনকারীদের বাধা দেয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অন্তত একজন আক্রমণকারী অ্যাসল্ট রাইফেল দিয়ে সরাসরি স্কুল লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে।

 মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক অবরোধ

আল-মুঘাইয়ির গ্রামে এটিই প্রথম হামলা নয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাদের কৃষিজমি ও জলপাই বাগানগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বসতি স্থাপনকারীরা নিয়মিতভাবে জলপাই গাছ কেটে ফেলছে এবং পশুপালনে বাধা দিচ্ছে। হামলার ভয়ে চাষিরা এখন তাদের জমিতে যেতে পারছেন না, ফলে এলাকাটি ধীরে ধীরে খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান অবস্থা

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বারবার এই 'বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাস' (Settler Violence) বন্ধের আহ্বান জানালেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ইসরায়েলি সামরিক প্রধান ইয়াল জামির নিজেও এই সহিংসতাকে "অগ্রহণযোগ্য" বলে অভিহিত করেছেন, যদিও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের হার নেই বললেই চলে।

বুধবার নিহত আওস নাসানের জানাজায় হাজারো মানুষ জড়ো হন। সেখানেও ইসরায়েলি বাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে শোকমিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে বলে খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, এটি কেবল ভূমি দখল নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া।

Advertisement
Advertisement
Advertisement