সংবাদ শিরোনাম

নির্বাচনের আগে লিকুদে প্রার্থী বাছাই শুরু

 প্রকাশ: ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

নির্বাচনের আগে লিকুদে প্রার্থী বাছাই শুরু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইসরায়েলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টি প্রার্থী বাছাইয়ে প্রাথমিক নির্বাচন বা প্রাইমারি আয়োজন করছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদের জন্য এবারের নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে লিকুদের প্রাইমারি বরাবরই উত্তপ্ত ও বিশৃঙ্খল হয়ে থাকে। এবারও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং লিকুদের ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনার ওপরও এই নির্বাচনের বড় প্রভাব পড়তে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ লিকুদ

১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে লিকুদ নেতা মেনাখেম বেগিন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের লেবারপন্থী বাম ঘরানার আধিপত্যের অবসান ঘটে।

এরপর লিকুদ দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আনে এবং মূলধারার রাজনীতিকে আরও ডানদিকে সরিয়ে নেয়। দলটির নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৮২ সালে লেবাননে অভিযান, ২০০০ সালে দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার সময় সামরিক অভিযানসহ একাধিক বড় যুদ্ধ ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। গাজায় চলমান যুদ্ধও এর মধ্যে রয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রশ্নেও লিকুদ আগের সরকারি অবস্থান থেকে সরে গেছে। আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধিতা করে দলটি বসতি স্থাপন ও সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের প্রতি সমর্থন বাড়িয়েছে।

১৯৯০-এর দশকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) মধ্যে হওয়া দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের অগ্রগতিও পরবর্তী লিকুদ সরকারগুলো থামানোর চেষ্টা করেছে। গত দুই দশকে নেতানিয়াহুর ইসরায়েলি রাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর শান্তি প্রক্রিয়াটির বিরোধিতাও দেশটিতে ব্যাপক হয়েছে।

প্রার্থী তালিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রতিটি দল তাদের প্রার্থীদের একটি তালিকা জমা দেয়। তালিকার শুরুতে থাকেন দলের নেতা ও নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি এমন প্রার্থীরা। নিচের দিকে থাকা প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

১২০ সদস্যের নেসেট বা পার্লামেন্টে আসন বণ্টন হয় প্রতিটি দলের ভোটের অনুপাতে। গত নির্বাচনে লিকুদ ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। একই হার পেলে এবারও তাদের তালিকার প্রথম ৩২ জন নেসেটে আসন পেতে পারেন।

লিকুদ ছাড়াও ডেমোক্র্যাটস ও বামপন্থী হাদাশসহ অল্প কয়েকটি ইসরায়েলি দলকে সদস্যদের ভোটে প্রার্থী ও তালিকার ক্রম নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয়।

নারী, তরুণ ও সাম্প্রতিক অভিবাসীদের জন্য নির্ধারিত আসন বাদ দিলে নেতানিয়াহু নিজে কয়েকজন প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ রাখেন। দলীয় নেতা হিসেবে তাঁর জন্য আটটি আসন এবং দলের অভ্যন্তরীণ সমঝোতার মাধ্যমে আরও তিনটি আসন নির্ধারিত রয়েছে।

ফলে তালিকার প্রথম ৩০টি আসনের মধ্যে অন্য প্রার্থীদের জন্য বাস্তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থাকে মাত্র ১৫টিতে।

সমঝোতায় যাঁরা এগিয়ে

লিকুদ দলীয় নেতা হিসেবে নেতানিয়াহুর জন্য আটটি আসন রাখার পাশাপাশি আরও তিনজন নেসেট সদস্যকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সারের জন্য এমন একটি সমঝোতা হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে তাঁর নিউ হোপ পার্টি লিকুদের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর এই সুযোগ তৈরি হয়।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তালিকায় থাকবেন। দলের সংবিধান কমিটির চেয়ারম্যান হাইম কাটজও এ বছরের প্রাইমারির আগে করা বিশেষ সমঝোতার মাধ্যমে তালিকায় জায়গা পেয়েছেন।

আলোচিত প্রার্থীরা

লিকুদের মন্ত্রীদের মধ্যে ইসরায়েল কাটজকে সাধারণত সবচেয়ে কট্টর ও স্পষ্টভাষী হিসেবে দেখা হয়। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ এই মন্ত্রী গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে তিনি গাজায় পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা আটকে রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি গাজার চারপাশে ইসরায়েলি নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে গাজায় নতুন ইসরায়েলি বসতি এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

সম্প্রতি তিনি হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনা রাখার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।

গিদিওন সারও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এবং ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক সমালোচকদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের পক্ষেও তিনি অবস্থান নিয়েছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার পেছনে জাতিসংঘসহ অনেকে যে মানবিক সহায়তা সীমিত করার নীতিকে দায়ী করেছিলেন, সার সেই নীতিরও সমর্থন করেছিলেন।

হাইম কাটজ নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র। প্রধানমন্ত্রীর মতো তিনিও দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের জোরালো সমর্থক এই রাজনীতিক ২০২৪ সালে গাজায় নতুন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

নেতানিয়াহুর পছন্দের আরও প্রার্থী

এখন পর্যন্ত নেতানিয়াহু নিজে কাদের মনোনয়ন দেবেন, তা প্রকাশ করেননি। তবে তিনি কয়েকজন প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাবেক ওতজমা ইয়েহুদিত এমপি আলমোগ কোহেনও রয়েছেন।

নেতানিয়াহু প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ওরেন ডব্রনস্কিকেও তালিকায় জায়গা দিয়েছেন। নির্বাচিত হলে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর দায়িত্ব তিনি নেবেন বলে জানিয়েছে লিকুদ।

ডব্রনস্কি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কম্পিউটিং ইউনিট মামরামের ছয় বছরের সাবেক সদস্য এবং সিলিকন ভ্যালিতেও কাজ করেছেন।

তবে চলতি সপ্তাহের শুরুতে তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা পুরোনো মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইতে হয়। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বে হামলার পরও ডব্রনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। প্রতিবেশী আরব দেশগুলোকে কয়েক দিনের জন্য যত বেশি সম্ভব ফিলিস্তিনিকে গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে পরে গাজায় ‘একটি বিড়ালও জীবিত থাকা উচিত নয়’-এমন মন্তব্যও করেছিলেন তিনি।

সূত্র: আলজাজিরা