হরমুজ নিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণের দাবি, ওমানকে হুমকি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে বাধা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমানকে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে ৬০ দিনের সমঝোতার সময়সীমা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারি এল।
সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, পাঁচ মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যে ইরানের উচিত ‘আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা’ ওড়ানো। একই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁর প্রশাসন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি গোপন পথও চালু করেছে।
আইআরজিসির সদস্যদের ‘ভালো পোকার খেলোয়াড়’ বলে মন্তব্য করে ট্রাম্প বলেন, তারা ‘মৃত্যুর মুখে’। তবে সংঘাত দ্রুত শেষ করার কোনো তাড়া তাঁর নেই বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য তাঁর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই এবং তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাতটি তাঁর রাজনৈতিক সমর্থনে প্রভাব ফেলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
হরমুজ নিয়ে উত্তেজনা
ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল অবরোধ করে রাখায় গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ আবার খুলে দিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান ও ওমানের কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন। বিশ্বে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালির নৌযান চলাচল নিয়ে তেহরান নিজস্ব তদারকির দাবি জানিয়ে আসছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, প্রণালিতে নৌযান চলাচলের জন্য নতুন একটি পথ নিয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানায়, এ বিষয়ে একটি যৌথ ঘোষণার কাজ চলছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ইরান ও ওমান-দুই দেশের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা হবে।
বাঘাই বলেন, দুই উপকূলীয় দেশের সার্বভৌম অধিকার রক্ষা এবং একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এবারই প্রথম এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, তেহরান ও ওয়াশিংটনের অচলাবস্থার কারণ মধ্যস্থতাকারীর অভাব নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের এমন কিছু পদ্ধতির ওপর বারবার নির্ভরতা, যা তাঁর ভাষায় ‘শত শতবার ব্যর্থ হয়েছে’।
৬০ দিনের সমঝোতা নিয়ে ইরানের আপত্তি
নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সমঝোতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তবে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র আগেই সমঝোতা লঙ্ঘন করায় ওই সময়সীমার কার্যত আর কোনো গুরুত্ব নেই।
বাঘাইয়ের দাবি, সমঝোতা স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে তা লঙ্ঘন করেছিল। ফলে প্রকৃত অর্থে কোনো আলোচনাই শুরু হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নতুন নিষেধাজ্ঞা, এমনকি স্থলপথে অবরোধের খবরও ইরানকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করবে না বলে জানান তিনি।
বাঘাই বর্তমান সংকটকে ১৯৫৩ সালে ইরানে সংঘটিত অভ্যুত্থান থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘদিনের বৈরিতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর দাবি, ডেমোক্র্যাট প্রশাসনগুলোর আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিও তেহরানের অবস্থান বদলাতে পারেনি।
তিনি বলেন, চাপের মুখে ইরান সিদ্ধান্ত নেয় না।
আলোচনার বদলে পাল্টাপাল্টি দাবি
মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা চালালেও ৬০ দিনের সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো পক্ষই তা বাড়ানোর আগ্রহ দেখায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত তেহরান এখনো নেয়নি।
অন্যদিকে ট্রাম্প শুক্রবার হুমকি দেন, প্রয়োজনে তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশ ঘোষণা করতে পারেন। জবাবে ইরান বলেছে, তাদের অবরোধে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি জলপথ ‘ইরানিরই থাকবে’।
হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ব্রায়ান ক্লার্কের মতে, দুই দেশই এখন বাস্তবসম্মত সমাধানের বদলে সর্বোচ্চ দাবি সামনে আনছে। তাঁর ভাষায়, তারা প্রকৃত অর্থে আলোচনা করছে না; বরং নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করে অপর পক্ষকে পিছু হটার অপেক্ষায় রয়েছে।
ক্লার্ক বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরও কঠোর করার সুযোগ ওয়াশিংটনের সীমিত। এতে মার্কিন বাহিনীও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শুধু বিমান শক্তি দিয়ে কোনো যুদ্ধের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে শেষ পর্যন্ত যে সামরিক পথটি থাকতে পারে, তা হলো হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে সেখানে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজকে সামরিক শক্তি দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া। এ জন্য নৌ ও বিমানবাহিনীকে সরাসরি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল রক্ষা করতে হবে, যা ওয়াশিংটন এখনো করেনি।
ক্লার্কের ধারণা, শেষ পর্যন্ত ইরান ও ইয়েমেনিরাই কোনো ধরনের ফি আদায়ের ব্যবস্থা রেখে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। আর ওয়াশিংটন এমন একটি সমাধান খুঁজবে, যেটিকে নিজেদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর নয় বলে উপস্থাপন করা যায়।
সূত্র: আলজাজিরা