জুলাই গণঅভ্যুত্থান: বৈষম্যবিরোধী চেতনার বিজয়গাথা
ইমদাদ ইসলাম
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। এই আন্দোলন
২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলেছিলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের নেতৃত্বে
এ আদোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে যা পরবর্তীতে অসহযোগ
আন্দোলনে রূপ নেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ব্যাপ্তিতে
অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেকটা দীর্ঘ এবং এর প্রভাব
সুদুরপ্রসারী। যাবতীয় রাষ্ট্রশক্তির সামনে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা ছিল অকুতোভয়। রাজপথে
এ আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ হলেও আন্দোলনের চেতনা ও তাড়না দেশের আপামর মানুষ ধারণ করেছে
বহুদিন থেকে। চূড়ান্ত পর্বে প্রায় সর্বস্তরের মানুষ এতে নানাভাবে অংশ নিয়েছিলো এ আন্দোলনে।
কারণ ভিন্ন থাকলেও উদ্দেশ্য ছিল এক একটা অগণতান্ত্রিক ও জনবিচ্ছিন্ন সরকারকে হটানো।
আন্দোলনের। পরিসমাপ্তি ঘটে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাশীল সরকারের
পতনের মাধ্যমে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের মানুষকে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের
সুযোগ করে দিয়েছে। কর্তৃত্ববাদী সিস্টেম জনগণকে সবসময়ই শোষণ করে। কর্তৃত্ববাদী সিস্টেম
জনগণের মতামতকে তোয়াক্কা করে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় একচেটিয়া কর্তৃত্ব
কায়েম করে সব রকমের বিরোধী মত ও কার্যক্রম কার্যত রুদ্ধ করে দেয় এই কর্তৃত্ববাদী সিস্টেম।
মত প্রকাশের অধিকার, বিচার পাওয়ার অধিকার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সবকিছুই পরিচালিত হয়
স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায়। জনগণ হয়ে ওঠে অসহায়। আইনি পথে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর
যখন আর কোনো পথ না থাকে না, তখন জনক্ষোভের এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আমাদের
দেশেও ঠিক তেমনি জনক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশই ঘটলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য
দিয়ে। এই অত্যুত্থানে সারা দেশের নাগরিক শক্তির এক অসাধারণ ও দুঃসাহসী ঐক্য গড়ে ওঠে,
যা চেপে বসা দেড় দশকের ক্ষমতাসীন শাসককে উৎখাত করে।
২০১৮ সালে জারি করা কোটা বাতিলের পরিপত্র বাতিল করে প্রথম ও দ্বিতীয়
শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের আদেশ
জারি করে হাইকোর্ট। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট বিভাগের এ আদেশের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের
মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ বিরাজ করছিল। তাদের দাবি ছিল, এই ব্যবস্থা মেধাভিত্তিক
নয়, বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকৃত মেধাবীদের বঞ্চিত করছে।
সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ অন্যান্য সংরক্ষিত কোটার আওতায় একটি বড়ো অংশ বরাদ্দ
থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিজ যোগ্যতায় চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ
ওঠে। শিক্ষার্থীরা এর স্বায়ী সমাধান চাচ্ছিল। পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের নেতৃত্বে
এ আন্দোলনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয়। 'কোটা না মেধা, মেধা মেখা', মেধার মান দাও, কোটার অবসান
চাও', 'সমান সুযোগ, ন্যায্য অধিকার' স্লোগানে ফুঁসে ওঠে ক্যাম্পাসগুলো। ১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের
করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের উপর সহিংসতা ও দমন-পীড়নের কারণে আন্দোলন আরও বেগবান
হয় এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে তা দ্রুত সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে চার দফা
দাবিতে 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন'-এর ব্যানারে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা লাগাতার
কর্মসূচি দেয়। ২ থেকে ৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্বানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন,
মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ৭ জুলাই শিক্ষার্থীরা 'বাংলা ব্লকেড'-এর ডাক দেয় যার
আওতায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল, মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। শিক্ষার্থীদের
এই কর্মসূচির কারণে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল।
বাংলা ব্লকেড চলাকালে রাজধানীতে শুধু মেট্রোরেল চালু ছিল। প্রায় ৫ ঘণ্টা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ
বেশ কয়েকটি রাস্তা অবরোধ শেষে রাত আটটার পর রাস্তা ছাড়ে আন্দোলনকারীরা। এ আপোলন ছিল
সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক আন্দোলন।
১৬ জুলাই কোটা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের
কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্র শহীদ আবু সাঈদ। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে পুলিশ আবু সাঈদকে খুব
কাছ থেকে গুলি করে। আর আবু সাঈদ এক হাতে লাঠি নিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নিরস্ত্র আবু সাঈদের পুলিশ
কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই
হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সোচ্চার হন বহু মানুষ, যাতে আরও গতিশীল হয় আন্দোলন। তার এই
মৃত্যুতে কোটা আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়। ২৫ বছর বয়সি আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার
আন্দোলনের। অন্যতম সমন্বয়ক।
কোটা সংস্কার আন্দোলন যে-সকল শিক্ষার্থীর মৃত্যু সবচেয়ে বেশি আলোড়ন
তুলেছে তার মধ্যে অন্যতম ২৬বছরের মীর মাহফুজুর রহমান (মুগ্ধ)। ১৮ জুলাই ঢাকার উত্তরার
আজমপুরে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের হাতে পানির বোতল তুলে দিচ্ছিলেন মুগ্ধ। সেদিন টি-শার্টের
হাতা দিয়ে টিয়ার গ্যাসে জ্বলতে থাকা চোখ মুছতে মুছতেই পানি নিয়ে ছুটে যাচ্ছিলেন সবার
কাছে। এর মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায়, দুপুরের উত্তাপে বিশ্রাম নেওয়ার সময় কপালে বুলেটবিদ্ধ
হয়ে শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মুগ্ধ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক
শেষ করে ঢাকায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) এমবিএ করছিলেন মুগ্ধ।
লেখাপড়ার পাশাপাশি ভালো খেলোয়াড়, গায়ক, সংগঠক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন মুগ্ধ।
রাজধানীর রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ফারহান
ফাইয়াজ (রাতুল) তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের সম্পর্কে লিখেছিল, 'একদিন পৃথিবী ছেড়ে
চলে যেতে হবে। তবে এমন জীবন গড়ো, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ তোমাকে মনে রাখে।' ১৮ জুলাই
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফারহান ধানমন্ডি এলাকায় অবরোধ করছিল। সেখানে পুলিশের
গুলিতে তার মৃত্যু ঘটে। তার বুকে ও মুখে ছিল রাবার বুলেটের ক্ষতচিহ্ন। ফারহানের মৃত্যুর
পর তার আত্মীয় নাজিয়া খান ফারহানের হাসিমাখা একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লেখেন, 'দিস
ইজ মাই ফারহান ফাইয়াজ। হি ইজ ডেড নাও। আই ওয়ান্ট জাস্টিস।' চোখের সামনে এতো এতো করুন
মৃত্যু দেশবাসী মেনে নিতে পারছিলো না। এদিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে
গুলিতে নিহত হন ঢাকা টাইমসে কর্মরত সাংবাদিক হাসান মেহেদী।
গণগ্রেপ্তার, হামলা, মামলা ও গুমের প্রতিবাদে ৩১ জুলাই বুধবার সারাদেশে
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন 'মার্চ ফর জাস্টিস' কর্মসূচি পালন করে। ১ আগস্ট ডিবি হেফাজতে
থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে অনেক নাটকের পর মুক্তি দেওয়া হয়। ৩
আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ এবং সরকারের
পদত্যাগের এক দফা আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। ঘটনা দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। ৬ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী
আন্দোলন 'লং মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘোষণা করে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় তা একদিন এগিয়ে
৫ আগস্ট ঘোষণা করা হয়। ৫ আগস্ট এক দিনেই ১০৮জন সাধারণ নাগরিক ও পুলিশ নিহত হয়। অবশেষে
সেই বহু কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে এক উজ্জ্বল তরুণ প্রজন্মের অভিষেক
ঘটিয়েছে। এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে শিক্ষার্থীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং
সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। এটি ছিল কেবল কোটা সংস্কার নয়, বরং সমতার প্রশ্নে
একটি নৈতিক প্রতিবাদ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করেছে সবার আগে দেশ। তাইতো প্রধান
উপদেষ্টা যথার্থই বলেছেন, "জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের তরুণ সমাজ জাতিকে, দেশকে
একটি নতুন স্বপ্ন দেখানোর যে প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, সেটি সফল করার ক্ষেত্রেও তরুণ
সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে যে স্বপ্নের
বাংলাদেশ আমরা বিনিমাণ করতে চাই সেই পথে তরুণ সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
এটি একটি আদর্শ, একটি স্বপ্ন, যেখানে দেশ ও জনগণের কল্যাণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।"
আবু সাঈদ, শান্ত, মুগ্ধ, প্রিয় ও ফারহান ফাইয়াজের মতো শতশত বীরের রক্তের দামে কেনা এ নতুন বাংলাদেশ। জাতি কী ভুলে যাবে ছয় বছরের নিয়া গোপের কথা, যে কি না বাসার ছাদে খেলার সময় বাবার কোলে থাকা অবস্থায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। রাকিব হাসান আর নাইমা সুলতানার মতো বীর তরুণরা আছে আমাদের হৃদয় জুড়ে। অটোরিকশা চালক রনি, দুখ বিক্রেতা কিশোর মোবারক, তাদের ত্যাগের মূল্য কীভাবে দিবে এ জাতি। বীরের এই রক্তস্রোত, মায়ের অশ্রুধারা কোনোভাবেই যেন বৃথা না যায় তা নিশ্চিত করতে হবে সকলকে। তাদের এই আত্মত্যাগ জাতি চিরকাল মনে রাখবে।