সংবাদ শিরোনাম

অফসিজন তরমুজ চাষ পদ্ধতি

 প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:০১ অপরাহ্ন   |   কৃষি

অফসিজন তরমুজ চাষ পদ্ধতি

তরমুজ একটি সুস্বাদু ফল। তরমুজে রয়েছে অনেক পুষ্টি ও ঔষধিগুণ। তরমুজ প্রাকৃতিকভাবেই এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এবং ভিটামিন এ, বি, সি এর একটি ভালো উৎস। এটি রাতকানা, কোষ্টকাঠিন্য, অন্ত্রিয় ক্ষত, রক্তচাপ, কিডনিসহ নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধ করে। গরমের দিনে ঘামের সাথে শরীর থেকে অনেক লবণ ও পানি বের হয়ে যায়। তরমুজে প্রায় ৯৬ ভাগই পানি ও প্রচুর খনিজ লবণ থাকায় দেহের লবণ ও পানির ঘাটতি পূরণ করতে তরমুজের কোন তুলনা নেই।

তরমুজের জাত 

অসময়ে চাষের জন্য সুগারবিট, ব্লাক বেবি, ব্লাক সুইট, পাকিজা, ইয়লো ক্রাইড ও সুগার কিং চাষিদের নিকট জনপ্রিয় জাত। দেশী জাতগুলোর মধ্যে গোয়ালন্দ ও পতেঙ্গা উল্লেখযোগ্য।

বংশ বিস্তার 

তরমুজের বংশবিস্তার সাধারণত বীজ দ্বারাই করা হয়ে থাকে। অসময়ে তরমুজ চাষের জন্য পলিব্যাগে চারা তৈরি করা যেতে পারে, এতে বীজের অপচয় কম হয়।

জমি/মাদা তৈরি 

প্রয়োজনমতো চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। জমি তৈরির পর মাদা করতে হবে। প্রতিটি মাদা ১ ফুট দৈর্ঘ্য, ১ ফুট প্রস্থ ও  ১ ফুট গভীর করে প্রস্তুত করতে হবে। মাদা থেকে মাদার দূরত্ব ২ হাত বা ৩ ফুট রাখা উত্তম।

মাদা প্রতি সারের পরিমাণ :

সারের নাম

পরিমাণ

জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি মাদা তৈরি করে সব সার মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর প্রতিটিতে ২টি করে চারা রোপণ করতে হবে।

জৈব/কম্পোস্ট সার

৮-১০ কেজি

টিএসপি

২০০-২৫০ গ্রাম

এমওপি

১৫০-২০০ গ্রাম

দস্তা

২৫-৩০ গ্রাম

জিপসাম

৮০-১০০ গ্রাম

বোরন 

২০- ২৫ গ্রাম

 

উৎপাদন মৌসুম 

সুনিষ্কাশিত উঁচু বেলে দো-আঁশ মাটিতে জুন (জ্যৈষ্ঠ–আষাঢ়) মাসে মাদা তৈরির কাজ শুরু করতে হবে।

বীজ বপন

মাদা তৈরির ১ সপ্তাহ পর মাদা প্রতি ২টি করে অংকুরিত বীজ সরাসরি মাদায় রোপণ করতে হবে।

 

বীজের অংকুরোদগম 

তরমুজের বীজ একটি পরিষ্কার পাত্রে প্রায় ৬ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে অংকুরোদগম উপযোগী করে নিতে হবে। তরমুজ চাষিরা বীজের অংকুরোদগম করার জন্য স্হানীয় পদ্ধতি অবলম্বন করেন। একটি মাটির পাত্রে বালি, ধানের চিটা বা শুকনো গোবরের ভেতরে ভেজানো বীজ রেখে অংকুরিত করা হয। ধানের চিটা বা শুকনো গোবর গুঁড়া করে সামান্য পানি দিলে কিছুটা গরম অনুভব হয়। ভেজানো বীজ একটি সূতির কাপড়ে মুড়িয়ে ভালোভাবে পানি ঝরিয়ে বালু, ধানের চিটা বা গোবরের গুঁড়ার ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি গভীরে রেখে দিতে হয়। এভাবে ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে বীজগুলো অংকুরিত হয়ে থাকে।

চারা রোপণ 

মাদা তৈরির ৭-১০ দিন পর মাদাপ্রতি ২টি করে অংকুরিত বীজ বপণ করতে হবে।

সার প্রয়োগ

মাদায় সার দিয়ে অংকুরিত বীজ/চারা রোপণ/বপণের পর চারা ২০-৩০ সেন্টিমিটার (পৌনে ১ ফুট থেকে ১ ফুট) লম্বা হলে প্রতি ১৫-২০ দিন পর পর ৩ কিস্তিতে মাদাপ্রতি ৭০-৮০ গ্রাম হারে ইউরিয়া ও ৩৫-৪০ গ্রাম হারে এমওপি সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ফুল আসার ২ সপ্তাহ পর সল্যুবল বোরন ১ গ্রাম/লিটার অথবা বরিক পাউডার দেড় থেকে ২ গ্রাম/লিটার নিয়মিতভাবে স্প্রে করলে ফলের আকৃতি সুন্দর হয়।

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা 

শুকনো মৌসুমে সেচ দেয়া খুব প্রয়োজন। গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। মাটির জো অবস্থা বুঝে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপণের পর মালচিং দিলে মাটির রস সংরক্ষিত হয়। তাছাড়া চারা রোপণের সময় মালচিং করলে বৃষ্টিজনিত কারণে কাদা ছিটে চারা মারা যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়। অসময়ে তরমুজ চাষ সাধারণত ঘেরের পাড়ে হয়ে থাকে, এ কারণে গাছ মাচায় ওঠার আগ পর্যন্ত পার্শ্ব কুশি কর্তন করতে হবে। গাছে ফল আসার পর ফল সমেত ডগা নেটের ব্যাগে দিয়ে বেঁধে দিতে হবে, তা না হলে বাতাসে ফল সমেত ডগা ছিঁড়ে যেতে পারে। প্রতিটি গাছে ৩-৪টির বেশি ফল রাখতে নেই। গাছের শাখার মাঝমাঝি গিটে যে ফল আসে সেটি রাখতে হয়। ৩০টি পাতার জন্য একটি ফল রাখা বিজ্ঞানসম্মত।

পরাগায়ন

তরমুজ গাছে স্ত্রী ও পুরুষ দুই রকমের ফুল হয়। ভোর বেলায় স্ত্রী ও পুরুষ ফুল ফোটার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী ফুলকে পুরুষ ফুল দিয়ে পরাগায়িত করে দিলে ফল ঝরে যায় না এবং ফলের আকার ভালো হয়।

 

 

 

পোকামাকড় ও রোগবালাই 

রেড পামকিন বিটল পোকা :  চারা অবস্থা থেকেই এ পোকা আক্রমণ করে থাকে। বীজ থেকে ২ পাতা বের হওয়ার পর এদের আক্রমণের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রথম দিকে পোকাগুলোর সংখ্যা যখন কম থাকে, তখন পোকা, ডিম ও বাচ্চা ধরে নষ্ট করে ফেলতে হবে। মেহগনি তেল বা নিমবিসিডিন দিয়ে পুরো গাছ ভিজিয়ে দিলে মাটির নিচে থাকা লার্ভাসহ পূর্ণবয়স্ক পোকা নিস্তেজ হয়ে মারা যায়। এ ছাড়া ঘন নেট দিয়ে তৈরি ছোট ছোট খাঁচা দিয়ে চারা ঢেকে দিলে এ পোকার আক্রমণের হাত থেকে চারা রক্ষা পায়। পরে ৫/৬ পাতা বের হলে খাঁচা সরিয়ে ফেলতে হবে, তখন এ পোকা তেমন ক্ষতি করতে পারে না। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে চারা গজানোর পর প্রতি মাদার চারিদিকে মাটির সঙ্গে চারা প্রতি ২ থেকে ৫ গ্রাম অনুমোদিত দানাদার কীটনাশক (কার্বফুরান জাতীয় কীটনাশক) মিশিয়ে গোড়ায় সেচ দিতে হবে।

জাব পোকা

এ পোকা গাছের কচিকাণ্ড, ডগা, ও পাতার রস শুষে খেয়ে ক্ষতি করে। এ পোকা দমনের জন্য ইয়েলো ট্রাপ ব্যবহার করা যায়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে সুমিথিয়ন/ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি ২ মিলি/লিটার মাত্রায় স্প্রে করতে হবে।

মাছি পোকা 

এ পোকার আক্রমণে কচি অবস্থায় ফল নষ্ট হয়ে যায় বলে ফলন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেতে পারে। মাছি পোকায় আক্রান্ত ফল দ্রুত পচে যায় এবং গাছ হতে মাটিতে ঝরে পরে। আক্রান্ত ফলগুলো সংগ্রহ করে কমপক্ষে ১ ফুট পরিমাণ গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। সেক্স ফেরোমন ও বিষটোপ ফাঁদ যৌথ ব্যবহার করে এ পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিউলিওর নামক সেক্সফেরোমন পানি ফাঁদের ব্যবহার করা যায়।

কাণ্ড পচা রোগ 

এ রোগের আক্রমণে গাছের গোড়ার কাছের কাণ্ড পঁচে গাছ মারা যায়। প্রতিকারের জন্য ২.৫ গ্রাম ডায়থেম এম- ৪৫ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পর পর গাছে স্প্রে করতে হবে। 

ফিউজেরিয়াম উইল্ট রোগ 

এ রোগের আক্রমণে গাছ ঢলে পড়ে মারা যায়। পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা হলে এ রোগের প্রকোপ কম থাকে। রোগাক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। চাম্পিয়ন ২০ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে ১০ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

 

 

 

ফসল সংগ্রহ

চারা রোপণের ৩০ দিন পর থেকে ফুল আসা শুরু হয়। সাধারণত ফল পাকতে বীজ বোনার পর থেকে ৮০-৯০ দিন সময় লাগে। তরমুজের ফল পাকার সঠিক সময় নির্ণয় করা একটু কঠিন। কারণ অধিকাংশ ফল পাকার সময় কোন বাহ্যিক লক্ষণ দেখা যায় না। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখে তরমুজ পাকা কিনা তা অনেকটা অনুমান করা যায়:

ফলের বোঁটার সংগে যে আকর্শি থাকে তা শুকিয়ে বাদামি রং হয়।

খোসার উপরে সূক্ষ্ম লোমগুলো মরে গিয়ে তরমুজের খোসা চকচকে হয়।

তরমুজের যে অংশটি মাটির উপরে লেগে থাকে তা সবুজ থেকে উজ্জ্বল হলুদ রঙের হয়ে ওঠে।

তরমুজের শাঁস লাল টকটকে হয়।

আঙ্গুল দিয়ে টোকা দিলে যদি ড্যাব ড্যাব শব্দ হয় তবে বুঝতে হবে যে ফল পরিপক্বতা লাভ করেছে। অপরিপক্ব ফলের বেলায় শব্দ হবে অনেকটা ধাতবীয়।

 

ফলন 

সাধারণত গাছ প্রতি ৮ থেকে ১০টি ফল পাওয়া যায়। ফলের আকার জাতভেদে আড়াই থেকে ৫ কেজি হলে ফল তোলা শুরু হয়। সবসময় গাছপ্রতি ৩/৪টি ফল রাখলে ফলের আকার ও ওজন ভালো পাওয়া যায়। ফল তোলার সময় হলে ৫-৬ দিন পূর্বে যে ফল আসবে তা রাখা যেতে পারে। সযত্নে চাষ করলে ভালো জাতের তরমুজ থেকে বিঘাপ্রতি ৮০-১০০ মণ ফলন পাওয়া যায়।

(সূত্র: কৃষি তথ্য সার্ভিস)