মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় সবচেয়ে বড় হুমকি ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য ইসরায়েলই সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মন্তব্য করেছে সিরিয়া। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে মাসিক বৈঠকে বৃহস্পতিবার ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল সিরিয়ার ভূখণ্ডে কোন দেশের সামরিক উপস্থিতি বৈধ এবং কোনটি হুমকি।
জাতিসংঘে সিরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ইব্রাহিম ওলাবি বলেন, তিনি বৈঠকে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তরের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে বিষয়টি তুলে ধরতে হয়েছে।
ওলাবির অভিযোগ, সিরিয়ার গ্রামগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনী প্রবেশ করেছে, মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সিরিয়া যখন মধ্যস্থতা ও সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন ইসরায়েল তার জবাবে বিমান হামলা, সামরিক অনুপ্রবেশ ও বিভিন্ন ধরনের লঙ্ঘনের পথ বেছে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ইসরায়েলের আগ্রাসন শুধু সিরিয়ার জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ হয়ে উঠেছে।
সিরিয়ার প্রতিনিধি গত ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি নেতাদের সিরিয়ার ভূখণ্ডের জাবাল আল-শেখ এলাকায় সফরের কথাও তুলে ধরেন। নিরাপত্তা পরিষদের বাইরে ৪৪টি দেশ ওই সফরের নিন্দা জানিয়েছিল। দেশগুলো এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং বেআইনি কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে।
তবে জাতিসংঘে ইসরায়েলের প্রতিনিধি ড্যানি দানন সিরিয়ার অভিযোগকে খাটো করে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেন তুরস্কের দিকে।
দাননের দাবি, সিরিয়ার ভূখণ্ডে তুরস্ক সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, সিরিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য ইসরায়েলের ছোট একটি প্রতিরক্ষামূলক এলাকা যদি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সিরিয়ার আরও বড় অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো তুরস্ককে কীভাবে হুমকি হিসেবে দেখা হবে না?
ইসরায়েলের প্রতিনিধি দাবি করেন, সিরিয়ায় তুরস্কের প্রায় ২০ হাজার সেনা এবং শতাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তুরস্ক সিরিয়ার প্রায় ৫ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, যা ইসরায়েলের কথিত নিরাপত্তা এলাকার চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বেশি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তুরস্ক সিরিয়ায় ইরানের অনুসৃত ছায়া-প্রভাব বিস্তারের কৌশল অনুসরণ করছে।
তুরস্ক অবশ্য এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। জাতিসংঘে দেশটির প্রতিনিধি আহমেত ইলদিজ বলেন, সিরিয়ায় তুর্কি সেনাদের উপস্থিতি দামেস্কের আমন্ত্রণেই হয়েছে।
তিনি বলেন, সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের বৈধ সহযোগিতাকে কলঙ্কিত করে সেটিকে হুমকি হিসেবে তুলে ধরার ইসরায়েলি প্রচেষ্টা তারা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। তাঁর মতে, নিজেদের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবেই ইসরায়েল তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ইলদিজ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সিরিয়ার ভূখণ্ডে ‘বেপরোয়া হামলা’ ও সামরিক অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সিরিয়া থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি করেন।
নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে চলা এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগে বিরক্তি প্রকাশ করেন সিরিয়ার প্রতিনিধি ওলাবি। তিনি বলেন, আসাদ আমলে সিরিয়ার বৈঠকগুলোতে বিভিন্ন দেশের হয়ে প্রক্সি বা পরোক্ষ সংঘাতের বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে থাকত। এখন আর সেই পরিস্থিতি থাকা উচিত নয়।
তাঁর ভাষায়, পুরোনো সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি সিরিয়ার মানুষের জন্য গভীরভাবে বেদনাদায়ক।
আসাদ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়া সিরিয়ায় বিভিন্ন দেশের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকেও সেই বিরোধই প্রকাশ্যে উঠে এসেছে-সিরিয়ার ভূখণ্ডে কার সামরিক উপস্থিতি বৈধ, আর কার উপস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
সূত্র: আলজাজিরা