ইসরায়েল আঞ্চলিক হুমকি, জাতিসংঘে কঠোর বার্তা জর্ডানের বাদশাহর
ছবি- সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইসরায়েল এখন পুরো অঞ্চলের জন্য একটি ‘আঞ্চলিক হুমকি’ এবং দেশটি ‘ভয়াবহ মাত্রার দায়মুক্তি’ নিয়ে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে দেওয়া ভাষণে তিনি ফিলিস্তিন সংকটকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করেন।
বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেন, বিশ্ব ইতিহাসের এক ‘অনন্য মুহূর্ত’ পার করছে। জ্ঞান ও পরিবর্তনের গতি আগে কখনো এত দ্রুত ছিল না। প্রতিদিনই নতুন সংকট, নতুন বিপর্যয় ও নতুন জরুরি পরিস্থিতি সামনে আসছে, যার দিকে বিশ্বের মনোযোগ দিতে হচ্ছে।
তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে মনোযোগ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ সীমিত সম্পদে পরিণত হয়েছে। কোন সংঘাত নিয়ে দীর্ঘদিন কূটনৈতিক তৎপরতা চলবে, কোনটি আলোচনার বাইরে চলে যাবে, ক্যামেরা সরে যাওয়ার পর কোনো যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না কিংবা মানুষের দুর্ভোগ কত দিন অসহনীয় থাকবে-এসবই অনেকটা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কোন দিকে যাচ্ছে তার ওপর।
গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে মানবিক দুর্ভোগ আরও গভীর হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জর্ডানের বাদশাহ। লেবানন, ইয়েমেন, সুদান ও ইরানের যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এসব সংঘাতের প্রভাব ওই অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে পড়ছে।
ইরান যুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে-এমন ধারণা ভুল। মুম্বাই থেকে মাদ্রিদ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার সাধারণ পরিবারের জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বিল দেখলেই এর প্রভাব বোঝা যায়। অস্থিতিশীলতা কত দ্রুত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও মানুষের জীবনকে অঞ্চলের বাইরেও বিপর্যস্ত করতে পারে, ইরান যুদ্ধ তা দেখিয়ে দিয়েছে।
এরপর গাজার প্রসঙ্গ তুলে বাদশাহ বলেন, কয়েক দশক ধরে তিনি এই পরিষদের সামনে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের সমাধান না করার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন।
তাঁর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমস্যাটির মুখোমুখি হয়ে সমাধান করার বদলে বছরের পর বছর সেটিকে শুধু ‘পরিচালনা’ করার চেষ্টা করেছে। বিশ্বের দীর্ঘতম দখলদারত্বগুলোর একটির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক আইন যদি কয়েক দশক ধরে উপেক্ষা করা যায়, তাহলে সেই আইনের মূল্য কী? আর তার লঙ্ঘনকে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করতেই যদি অনীহা থাকে, তাহলে আইন কীভাবে কার্যকর করা হবে?
গাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, তথাকথিত যুদ্ধবিরতির প্রথম ৩০০ দিনেই অন্তত ৩০০ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে।
ইসরায়েলি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য বারবার বদলানোর, গাজায় হামলা ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস চালিয়ে যাওয়ার এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকা থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতির অভিযোগ তোলেন তিনি।
এর ফলে গাজার ফিলিস্তিনিরা উপত্যকার মোট ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশেরও কম জায়গায় আটকে পড়েছেন বলে সতর্ক করেন বাদশাহ। তাঁর মতে, ইসরায়েলের এসব নীতিকে আর ‘সাময়িক সামরিক ব্যবস্থা’ কিংবা ‘যুদ্ধের পরিণতি’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, জবাবদিহি শুরু হয় কোনো ঘটনার প্রকৃত নাম বলার মধ্য দিয়ে। তাঁর ভাষায়, গাজায় যা ঘটছে তা ফিলিস্তিনিদের জীবন মুছে দেওয়া এবং ভূখণ্ডের নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
পশ্চিম তীরে ‘নতুন বাস্তবতা
বিশ্বের মনোযোগ যখন গাজায়, তখন পশ্চিম তীরে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটছে বলে সতর্ক করেন বাদশাহ আবদুল্লাহ।
তাঁর মতে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন, সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু আগের ঘটনার আরও বড় রূপ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর ভাষায়, ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা একটি প্রক্রিয়া এখন অনেক বেশি আগ্রাসী রূপ নিয়েছে।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এবং তাঁদের জমি ও সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে, বসতি সম্প্রসারণ করতে এবং ফিলিস্তিনিদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে।
বাদশাহ বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার সময় দাঁড়িয়ে থাকে। কখনো হামলাকারীদের সুরক্ষা দেয়, আবার কখনো নিজেরাও সহিংসতায় অংশ নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আহতদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স যেতে বাধা দেওয়া এবং সত্য তুলে ধরতে কাজ করা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদেরও লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তোলেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা চালানোর সময় সেনারা যদি তা প্রত্যক্ষ করে, সহায়তা করে কিংবা কখনো নিজেরাই অংশ নেয়, তাহলে বিষয়টিকে আর কয়েকজন ‘দাঙ্গাবাজের’ কর্মকাণ্ড বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার নীতি হিসেবে দেখার আহ্বান জানান বাদশাহ। তাঁর মতে, গাজা ও পশ্চিম তীরকে ফিলিস্তিনি জনগণের একই ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। গাজা ধ্বংস হয়েছে এবং পশ্চিম তীর কার্যত সংযুক্ত করে নেওয়া হয়েছে-এমন পরিস্থিতিতে কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
‘আরব বিশ্ব শান্তি চায়নি’-এই দাবি নাকচ
ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চায়নি আরব বিশ্ব-এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন জর্ডানের বাদশাহ।
তিনি ২০০২ সালের সৌদি আরবের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত আরব শান্তি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। ওই প্রস্তাবে শান্তির বিনিময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ৫৭টি আরব ও মুসলিম দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ রাখা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই প্রস্তাব রয়েছে। তাঁর মতে, শান্তির অংশীদারের অভাব নয়, বরং তা গ্রহণে প্রস্তুত ইসরায়েলি সরকারের অনুপস্থিতিই বড় বাধা।
ইসরায়েলি সরকার আন্তর্জাতিক মনোযোগের শক্তি বোঝে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা ও মনোযোগ তৈরি হয়েছে, তা পছন্দ না হওয়ায় নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের বদলে সমালোচকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাদশাহ বলেন, এসব বিভ্রান্তি আর কাজ করবে না; বিশ্বের মানুষ এখন ঘটনাগুলোর দিকে নজর রাখছে। এখন প্রশ্ন হলো-বিশ্ব কি পদক্ষেপ নেবে? তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার কারণ বিকল্পের অভাব নয়; এটি একটি সিদ্ধান্ত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ, বাণিজ্যিক অবরোধ এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মতো ব্যবস্থা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এসব পদক্ষেপ কাগজে থাকা প্রস্তাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায় বলে মন্তব্য করেন বাদশাহ। এর ফল হচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্র, যার ওপর কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ইসরায়েলি সরকারের ‘দায়মুক্তির বোধ’ ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, দেশটির নেতৃত্ব এখন আর ‘আমরা পার পেয়ে যাব কি না’-এই প্রশ্নও করছে না; তারা ইতিমধ্যেই উত্তরটি জানে বলে মনে করছে।
‘ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু ফিলিস্তিনে থামবে না’
ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু ফিলিস্তিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে-আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এমন ধারণা করা উচিত নয় বলে সতর্ক করেন জর্ডানের বাদশাহ। তাঁর মতে, ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী প্রবণতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই হুমকি তৈরি করছে।
সিরিয়ার পরিস্থিতিকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এমন একটি সতর্কবার্তা দেখতে পাচ্ছে, যেটি তারা উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর ভাষায়, পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে ইসরায়েল দেখছে তারা কত দূর যেতে পারে। আর প্রতিবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে নিলে তারা আরও দূর পর্যন্ত সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক আইনের সীমা অতিক্রম করতে পারে বলে মনে করছে।
জর্ডান এই বাস্তবতা খুব ভালোভাবেই বোঝে বলে মন্তব্য করেন বাদশাহ। একটি সংকট শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি সংকট সামনে আসা অঞ্চলে বসবাসের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ-দুটির মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই।
জর্ডান ন্যায়সংগত শান্তির প্রতি তার অঙ্গীকার কখনো ত্যাগ করবে না বলেও জানান বাদশাহ। ফিলিস্তিনিদের দৃঢ়তার প্রতি সমর্থন এবং জেরুজালেমের মুসলিম ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক ও আইনগত বর্তমান অবস্থান বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
জর্ডান এমন একটি দেশ হতে চায়, যার ওপর বিশ্ব নির্ভর করতে পারে-নীতিতে অটল, প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বস্ত, সবার সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত এবং শান্তি চায় এমন যেকোনো পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী-বলে জানান বাদশাহ আবদুল্লাহ।
গাজা, সুদান, ইউক্রেন কিংবা যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও আতঙ্কে থাকা বিশ্বের অন্য যেকোনো জায়গার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো সংকট কয়েক সপ্তাহের পুরোনো হোক কিংবা কয়েক দশকের, আন্তর্জাতিক মনোযোগের ওঠানামার সঙ্গে নীতির পরিবর্তন হওয়া উচিত নয়।
ভাষণের শেষদিকে বাদশাহ বলেন, মনোযোগ নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা চলছে, তখন কোন দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে কী বিষয় সেই মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিতে চাইছে, সেদিকেও সতর্ক নজর রাখতে হবে। তাঁর বক্তব্য, ভবিষ্যৎ শুধু আমরা কী করি, তা দিয়ে তৈরি হয় না; আমরা কী উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিই, সেটিও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
সূত্র: আরব নিউজ